
কিশোরগঞ্জের হাওড় অঞ্চলে প্রস্তাবিত ১৫ কিলোমিটার উড়ালসড়ক প্রকল্প বাতিলের পর ১৫৪ কোটি টাকার ব্যয় হিসাব নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ খাতে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য, বাস্তবে কোনো জমি অধিগ্রহণই করা হয়নি এবং এ খাতে কোনো অর্থ ছাড়ও দেওয়া হয়নি।
নিয়ম অনুযায়ী, অর্থ ছাড় ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ দেখানো সম্ভব নয়। ফলে এই বিপুল অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত যাওয়ার কথা থাকলেও তা হয়েছে কি না—এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এতে করে পুরো ব্যয় হিসাব নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
আরও পড়ুন:
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরুর আগেই এত বড় অঙ্কের ব্যয় দেখানো অস্বাভাবিক। এ কারণে প্রকল্পটির আওতায় দেখানো মোট ১৫৪ কোটি টাকার পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অন্যান্য খাতেও উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যানবাহন ভাড়া ৮৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা, অফিস ভাড়া ২৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং পরামর্শক সেবায় ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এছাড়া সম্মানি ও পারিশ্রমিক বাবদ ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা, সরবরাহ ও সেবায় ২ কোটি ২৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক খাতে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং আসবাবপত্র ক্রয়ে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য রয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে একনেক সভায় ৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদন পায়। এর লক্ষ্য ছিল মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রামকে কিশোরগঞ্জ সদর ও ঢাকার সঙ্গে সারা বছর সড়ক যোগাযোগে যুক্ত করা। প্রকল্পের আওতায় সড়ক প্রশস্তকরণ, সেতু, কালভার্ট, টোল প্লাজা এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।
আরও পড়ুন:
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অতিরিক্ত আরও ২ কোটি ৮ লাখ টাকা অপচয়ের তথ্য উঠে এসেছে।
প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গবেষণায় ২০৩০ সালে প্রতিদিন ২৫ হাজার ৮০০টি এবং ২০৪০ সালে ৩৫ হাজার ৫০০টি যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয়, যা দেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর তুলনায়ও বেশি। সংশ্লিষ্টরা এই পূর্বাভাসকে অস্বাভাবিক এবং অবাস্তব বলে মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশগত উদ্বেগও প্রকল্প বাতিলের একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে। সব মিলিয়ে বাস্তব কাজ শুরুর আগেই শতকোটি টাকার বেশি ব্যয় দেখানো, ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়াই বিপুল অর্থ হিসাবভুক্ত করা এবং প্রশ্নবিদ্ধ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা—সবকিছুই বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আরও পড়ুন:
এখন সরকারের তদন্তেই স্পষ্ট হবে, এই ১৫৪ কোটি টাকা আসলে কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে।






