
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অর্থায়নের টানাপোড়েন কাটিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রস্তাবিত ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ (সিইজেড)। বহুল প্রতিক্ষিত এই মেগা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিতে আজ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে ৪,১৮৯.৪৬ কোটি টাকার একটি বিশাল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, আগামী ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের আসন্ন চীন সফরের আগেই এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
১০ বছরের অচলাবস্থা কেটে নতুন দিগন্ত
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ, অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ এবং দ্বিপাক্ষিক প্রশাসনিক দরকষাকষির কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে ফাইলবন্দি অবস্থায় আটকে ছিল।
বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এই অচলাবস্থা নিরসন করা হয়েছে। আজ (৯ জুন) একনেক সভায় প্রস্তাবিত এই মোটা অঙ্কের প্রকল্পটির অনুমোদন মিললে মাঠ পর্যায়ের অবকাঠামো নির্মাণে আর কোনো বাধা থাকবে না বলে মনে করছেন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।
৪,১৮৯ কোটি টাকার মেগা অবকাঠামো প্রকল্পে যা থাকছে
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ৪,১৮৯.৪৬ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেট মূলত আনোয়ারার অর্থনৈতিক অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অবকাঠামোগত সংযোগ স্থাপনে ব্যয় করা হবে। এর মূল লক্ষ্য হলো চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। এই প্রকল্পের অধীনে প্রধান কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ভূমি উন্নয়ন ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ: বিশাল এই শিল্প অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ভূমির উপযোগিতা বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের জন্য বিশেষ সাব-স্টেশন ও পাইপলাইন নির্মাণ।
- যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং কর্ণফুলী টানেলের (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল) সাথে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংযোগ সহজ করতে চার লেনের সংযোগ সড়ক ও অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি।
- বর্জ্য শোধনাগার (CETP): পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা স্থাপন।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আগেই চুক্তি চূড়ান্ত করার তাগিদ
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এই প্রকল্পের টাইমিং বা সময় নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাচ্ছেন। এই সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে এক নতুন অধ্যায় রচনার প্রস্তুতি চলছে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের পরিকল্পনা হলো, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আগেই আনোয়ারার এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের চূড়ান্ত রূপরেখা ও বিনিয়োগ চুক্তি সইয়ের কাজ শেষ করা। যাতে করে সফরকালে এই অঞ্চলে বড় ধরনের চীনা বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হয়। একনেকে আজ এই প্রকল্পের অনুমোদন মূলত বেইজিংয়ের কাছে ঢাকার পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও শক্তিশালী বার্তা দেবে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে সম্ভাব্য প্রভাব
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দের মতে, আনোয়ারার এই চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করবে।
“চট্টগ্রাম বন্দর এবং কর্ণফুলী টানেলের নিকটবর্তী হওয়ায় এই জোনে উৎপাদিত পণ্য খুব সহজেই আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এটি শুধু চীনের তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স ও ভারী শিল্পের বিশাল বিনিয়োগই আকর্ষণ করবে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে অন্তত ১ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।”
শেষ কথা
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ এক দশক ধরে ঝুলে থাকা আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল এখন বাস্তবের মাটিতে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায়। আজ একনেক সভায় এই মেগা প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বিশেষ করে বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের চীন সফরের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্কের গভীরতা আরও বাড়বে এবং আনোয়ারা হয়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান শিল্প হাব—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।
RS/RIFAT/SL







