
আজকের পৃথিবী একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রাম। প্রযুক্তির এই যুগে কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। বিশেষ করে যখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমানায় অস্থিরতার আগুন জ্বলে, তখন সেই আগুনের আঁচ সীমান্ত পেরিয়ে পাশের ঘরে আসবেই—এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে যা ঘটছে, তা কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সচেতন মহলের মতে, প্রতিবেশী ভারতের আগ্রাসী মনোভাব এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী দর্শন আজ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।সীমানা যখন কেবলই রেখা,সৃষ্টিকর্তার সামনে দুনিয়া এক ও অভিন্ন। মানুষের তৈরি সীমানা রাজনীতির প্রয়োজনে হলেও সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক লড়াইয়ে এটি অনেক সময় গৌণ হয়ে যায়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় যা ঘটছে, তা আমাদের জন্য যথেষ্ট মাথাব্যথার কারণ। যদি আমরা মনে করি ওপারের অস্থিরতা আমাদের স্পর্শ করবে না, তবে বুঝতে হবে আমাদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় ঘাটতি রয়েছে। ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর ‘অখণ্ড ভারত’ বা গ্রেটার ইন্ডিয়া গড়ার যে স্বপ্ন, তার প্রথম লক্ষ্যবস্তু হিসেবে এই অঞ্চলটিই সবসময় আলোচনায় থাকে।
অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ও বাংলাদেশের অস্তিত্ব,ভারতীয় উগ্রপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের আদর্শিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ‘অখণ্ড ভারত’ গড়ার প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আসছে। এই আদর্শের মূল কথা হলো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে ভারতের মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করা। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, এই উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রথম শিকার হয় পার্শ্ববর্তী দুর্বল বা ছোট রাষ্ট্রগুলো। এই আগ্রাসী নীতির সামনে আমরা আজ এক অদৃশ্য যুদ্ধের সম্মুখীন। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি সত্যিই নিরাপদ?
আগুন লাগার অপেক্ষা কি বুদ্ধিমানের কাজ?
অনেকেই প্রশ্ন করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী? বাস্তবতা হলো, যখন ঘরে আগুন লাগে, তখন ‘কী করব’ বলে পরামর্শ চাওয়ার সময় থাকে না। তখন প্রথম কাজ হয় আগুন নেভানো। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ মনে করছে এখনো আগুন লাগেনি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উদাসীনতা এবং তথাকথিত ‘সুশীল’ চিন্তাধারা আমাদের দূরদৃষ্টিকে ঝাপসা করে দিয়েছে। কিন্তু সীমান্তের ওপারে উগ্রবাদের যে দাবানল জ্বলছে, তার স্ফুলিঙ্গ ইতোমধ্যেই এপারে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
শত্রুকে চিনুন: গুজরাটের সেই রক্তাক্ত ইতিহাস
কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে আগে সেই শত্রুর গভীরতা বুঝতে হয়। বর্তমান ভারতের শাসনকাঠামো যাদের হাতে, তাদের আদর্শিক ভিত্তি হলো উগ্র হিন্দুত্ববাদ। এই নৃশংসতার ইতিহাস না জানলে এর ভয়াবহতা বোঝা অসম্ভব। এক্ষেত্রে পাঠকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা।তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে যে ভয়াবহ মুসলিম নিধন চলেছিল, তা বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, নারীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন এবং শিশুদেরও রেহাই না দেওয়ার সেই করুণ ইতিহাস আজও মোদি সরকারকে তাড়া করে ফেরে। এই নৃশংসতার কারণেই তৎকালীন পশ্চিমা বিশ্ব মোদিকে ‘বুটচার অব গুজরাট’ বা ‘গুজরাটের কসাই’ তকমা দিয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
আজ সেই একই গোষ্ঠী ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসীন। যারা একটি অঙ্গরাজ্যে এমন ধ্বংসলীলা চালাতে পারে, তাদের ‘অখণ্ড ভারত’ স্বপ্ন প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।তথাকথিত ‘সুশীলতা’ ও চেতনার বিভ্রান্তি,আমাদের দেশের এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজ সবসময়ই প্রতিবেশীর আগ্রাসনকে ‘বন্ধুত্ব’ বা ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করেন। তারা উগ্র হিন্দুত্ববাদের ভয়াবহতাকে ছোট করে দেখান। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সস্তা সুশীলতা বা আবেগ কোনো সমাধান নয়। চেতনার দোহাই দিয়ে নিজের ঘরের চাবিকাঠি অন্যের হাতে তুলে দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। সময় এসেছে এই বিভ্রান্তিকর চেতনাগুলো পায়ের নিচে রেখে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার।আমাদের করণীয় কী?করণীয় একটাই—সচেতনতা এবং জ্ঞান অর্জন। শত্রুকে হাতের তালুর মতো চিনতে হবে। উগ্র হিন্দুত্ববাদ কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি বিপজ্জনক দর্শন যা অন্য ধর্ম বা মতাদর্শের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। তাদের ইতিহাস জানুন, তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করুন এবং তরুণ প্রজন্মকে এই আগ্রাসন সম্পর্কে সচেতন করুন।
প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক কাম্য হলেও, যখন সেই দেশ আমাদের অস্তিত্বের মূলে আঘাত করতে চায়, তখন চুপ থাকা অপরাধ। গ্লোবাল ভিলেজের এই যুগে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের চোখ কান খোলা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, গাফেলতি বা অবহেলা আমাদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। শত্রুকে চেনার মাধ্যমেই শুরু হোক আমাদের আত্মরক্ষার প্রথম ধাপ।






