
অনলাইন ডেস্ক | ঢাকা
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ JF-17 Thunder Block-3 যুদ্ধবিমানের ফ্লাইট সিমুলেটর হস্তান্তর করেছে পাকিস্তান। আঞ্চলিক বিভিন্ন টানাপোড়েন এবং প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়নের প্রতিযোগিতার মধ্যেই এই সিমুলেটর হস্তান্তরকে বেশ গুরুত্বের সাথে দেখছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। এই পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন আলোচনায় JF-17 Thunder?
পাকিস্তানের কামরা এয়ারক্রাফট ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরি (AMF) এবং চীনের চেংডু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপের (CAC) যৌথ উদ্যোগে তৈরি JF-17 Thunder বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সাশ্রয়ী ও কার্যকর যুদ্ধবিমান। বিশেষ করে এর সর্বশেষ সংস্করণ, অর্থাৎ Block-3 বর্তমান যুগের চতুর্থ প্রজন্মের প্লাস (4.5 Generation) যুদ্ধবিমানের সমকক্ষ বলে দাবি করা হয়।
সামরিক পরিমণ্ডলে JF-17 এর কার্যকারিতা প্রথম বড় আকারে আলোচনায় আসে ২০১৯ সালের ‘অপারেশন সুইফট রিটর্ট’-এর সময়। এরপর থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে এই বিমানের যুদ্ধক্ষমতা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। আকাশযুদ্ধ (Air-to-Air), স্থলভাগে নিখুঁত বোমা হামলা (Air-to-Ground) এবং সমুদ্রসীমায় জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলাসহ বিভিন্ন বহুমুখী (Multi-role) মিশনে এই বিমান অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করা যায়।
Block-3 ভার্সনের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, JF-17 এর পূর্ববর্তী সংস্করণগুলোর তুলনায় Block-3 সংস্করণে ব্যাপক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- AESA রাডার: এতে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (AESA) রাডার, যা একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত এবং নিখুঁতভাবে আঘাত করতে সক্ষম।
- উন্নত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার (EW) সিস্টেম: শত্রুপক্ষের রাডার এবং মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এতে রয়েছে বিশ্বমানের জ্যামিং ও আত্মরক্ষা প্রযুক্তি।
- দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র: এটি চীনের তৈরি আধুনিক পিএল-১৫ (PL-15) এর মতো দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে, যা প্রতিপক্ষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
- হেলমেট মাউন্টেড ডিসপ্লে (HMD): পাইলটের চোখের ইশারায় লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের জন্য এতে আধুনিক এই প্রযুক্তি যুক্ত রয়েছে।
রাফাল বনাম JF-17: আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা
প্রতিরক্ষা বাজারে ফ্রান্সের তৈরি ডাসো রাফাল (Dassault Rafale) এবং পাকিস্তানের JF-17 Thunder-এর সক্ষমতা নিয়ে প্রায়ই তুলনা চলে। রাফাল একটি টুইন-ইঞ্জিন হেভিওয়েট যুদ্ধবিমান, যার কার্যকারিতা এবং বৈশ্বিক বাজার বেশ সুদৃঢ়। অন্যদিকে, JF-17 একটি সিঙ্গেল-ইঞ্জিন লাইটওয়েট ফাইটার। রাফালের তুলনায় JF-17 এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও ক্রয়মূল্য অনেক কম হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে এর বাজার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আকাশযুদ্ধের আধুনিক কৌশলে হালকা ও আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন বিমানগুলো যে কোনো হেভিওয়েট বিমানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, যা JF-17 বারবার প্রমাণ করেছে।
বাংলাদেশে সিমুলেটর হস্তান্তরের তাৎপর্য
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘ফোর্সেস গোল’ এর আওতায় কাজ চলছে। পাইলটদের উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য বিশ্বমানের সিমুলেটর অত্যন্ত জরুরি। পাকিস্তান কর্তৃক এই পূর্ণাঙ্গ JF-17 Block-3 সিমুলেটর হস্তান্তর বাংলাদেশের পাইলটদের আধুনিক যুদ্ধবিমানের ককপিট অভিজ্ঞতা এবং এভিওনিক্স সিস্টেমের সাথে পরিচিত হতে সাহায্য করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিমুলেটর দেওয়ার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ এখনই JF-17 যুদ্ধবিমান কিনছে। তবে এটি ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা বাণিজ্যের একটি প্রাথমিক ধাপ হতে পারে। বাংলাদেশ সবসময়ই তার প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য বজায় রাখে। চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, বা আমেরিকার পাশাপাশি পাকিস্তানের তৈরি এই আধুনিক সিমুলেটর গ্রহণ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতির এক অনন্য ভারসাম্যকে নির্দেশ করে।
দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ একটি বড় বিষয়। পাকিস্তানের কাছ থেকে পাওয়া এই অত্যাধুনিক সিমুলেটর বাংলাদেশের সামরিক বিমান চালনা শিক্ষার পরিধিকে আরও উন্নত করবে। একই সাথে, আন্তর্জাতিক বাজারে JF-17 Thunder Block-3 এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে, আগামী দিনের আকাশযুদ্ধে এই বিমানটি একটি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে।






