
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া / ঢাকা:
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ) উপলক্ষে দেশীয় খামারিদের স্বার্থ সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। দেশে কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত গবাদিপশু মজুত থাকায় এবার পার্শ্ববর্তী দেশ (ভারত) থেকে কোনো পশু আমদানি বা অবৈধ উপায়ে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
রোববার (১৭ মে) বিকেলে বগুড়ার মম ইন কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন: আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, বাজার সংযোগ ও ভ্যালু চেইন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এই সিদ্ধান্তের কথা সাফ জানিয়ে দেন।
চাহিদার তুলনায় ২৩ লাখ গবাদিপশু উদ্বৃত্ত
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, “বাংলাদেশ এখন গবাদিপশু ও কোরবানির পশু উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ। আসন্ন কোরবানির ঈদে আমাদের যা চাহিদা, তার চেয়ে অনেক বেশি পশু দেশের খামারিদের কাছে প্রস্তুত রয়েছে।”
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, চলতি বছরে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৩ লাখেরও বেশি গবাদিপশু অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত রয়েছে। ফলে দেশের বাইরে থেকে বা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কোনো ধরনের গরু কিংবা অন্য কোনো পশু দেশে আনার কোনো যৌক্তিকতা নেই। দেশীয় খামারিদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও হাটের ইজারা বন্ধ
অবৈধ পথে দেশে পশুর প্রবেশ ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে সীমান্তে নজরদারি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনোভাবেই চোরাই পথে ভারতীয় গরু দেশের বাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দেশীয় খামারিরা যেন তাদের উৎপাদিত পশুর ন্যায্য মূল্য পান, তা নিশ্চিত করতে এবার সীমান্তবর্তী কোনো এলাকায় পশুর হাটের ইজারা দেওয়া হচ্ছে না। অতীতে যেসব সীমান্ত হাটে চোরাই পশুর কেনাবেচা হতো, খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় এবার তা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
খামারিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও চামড়ার ন্যায্য মূল্য
দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে উল্লেখ করে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু দেশের বাজারে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন নয়, ভবিষ্যতে আমরা বিদেশেও উন্নত মানের মাংস ও পশু রপ্তানি করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।”
খামারিদের বিভিন্ন সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার খামারিদের পাশে রয়েছে। মাঠপর্যায়ের খামারিরা যাতে খুব সহজে এবং স্বল্প সুদে কিংবা সহজ শর্তে ঋণ পেতে পারেন, সে বিষয়ে বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধার কাজ চলছে। এর ফলে প্রান্তিক খামারিরা অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বী হতে পারবেন।
একই সঙ্গে কোরবানির ঈদের সময় পশুর চামড়ার দাম কমে যাওয়ার বিষয়টি সরকারের বিশেষ নজরে রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার চামড়ার বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং পশুর চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
আধুনিক কসাইখানা উদ্বোধন ও পরিবেশ সুরক্ষা
সেমিনার শেষে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বগুড়া শহরতলীর জয়পুরপাড়ায় নবনির্মিত একটি অত্যাধুনিক জেলা কসাইখানার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট’ (LDDP) প্রকল্পের আওতায় এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০ শতাংশ জমির ওপর এই কসাইখানাটি নির্মাণ করা হয়েছে।
এই আধুনিক কসাইখানায় প্রতি ঘণ্টায় ১৫টি গরু এবং ৩০টি ছাগল বা ভেড়া সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে জবাই ও প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। কসাইখানাটি উদ্বোধনের পর তা বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
উদ্বোধনকালে প্রতিমন্ত্রী যত্রতত্র পশু জবাইয়ের কারণে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা যেখানে-সেখানে পশু জবাই করি, যা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং নানাবিধ রোগ ছড়ায়। এই আধুনিক কসাইখানা চালু হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষ এখন থেকে রোগমুক্ত ও সম্পূর্ণ নিরাপদ মাংস পাবেন।” দেশের প্রতিটি জেলায় ক্রমান্বয়ে এই ধরনের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক কসাইখানা গড়ে তোলা হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব দেলোয়ার হোসেন। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক শাহজামান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা প্রায় পাঁচ শতাধিক খামারি, ডেইরি ব্যবসায়ী এবং সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
মন্ত্রণালয় ও খামারিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবার কোরবানির পশুর বাজার সম্পূর্ণ স্থিতিশীল থাকবে এবং সাধারণ ক্রেতারা সাশ্রয়ী মূল্যে পশু কিনতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।






