
অনলাইন ডেস্ক | ঢাকা
রাজধানী ঢাকা তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। প্রতিদিনের মতো সকালটা গড়াচ্ছিল এক অলস আর চিরচেনা আমেজে। মিরপুরের পল্লবীর একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে আট বছরের ছোট্ট শিশু রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তার মা। কিন্তু হুট করেই যেন সব ওলটপালট হয়ে গেল। ঘরজুড়ে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না আদরের মেয়েটিকে। সময় যত গড়াচ্ছিল, মায়ের বুকের ভেতর উদ্বেগের পারদ ততটাই বাড়ছিল। ঘরের কোণ, বারান্দা, সিঁড়ি—সবখানেই চলল ব্যাকুল খোঁজ। কিন্তু রামিসা যেন কর্পূরের মতো মিলিয়ে গিয়েছিল।
অবশেষে সেই খোঁজাখুঁজি শেষ হলো, তবে এক বুক হাহাকার আর চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া এক বীভৎস দৃশ্যপটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। নিখোঁজ হওয়ার কিছু সময় পর প্রতিবেশীর বাসার খাটের নিচে মিলল শিশুটির রক্তাক্ত দেহ, যার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল মাথাটি! এর কিছুক্ষণ পরই ফ্ল্যাটের বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুটির খণ্ডিত মাথা। রাজধানী মিরপুরের পল্লবীতে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড স্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো দেশবাসীকে।
যেভাবে সামনে এলো গা শিউরে ওঠা সেই দৃশ্য
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পল্লবী থানাধীন ওই বাসায় মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন মা। তার আকুলতা দেখে ভবনের অন্য বাসিন্দারাও রামিসাকে খুঁজতে যোগ দেন। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ভবনের তৃতীয় তলায় নিজেদের ফ্ল্যাটের ঠিক উল্টো পাশের একটি বন্ধ দরজার সামনে পাওয়া যায় ছোট্ট রামিসার ব্যবহৃত স্যান্ডেল জোড়া।
জুতো দেখেই প্রতিবেশীদের মনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। তারা ভেতরে থাকা লোকজনকে বারবার দরজা খুলতে অনুরোধ করেন। কিন্তু ভেতর থেকে দীর্ঘ সময় কোনো ধরনের সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা একজোট হয়ে দরজা ভেঙে ফ্ল্যাটের ভেতরে প্রবেশ করেন।
ভেতরে ঢুকতেই তাদের চোখ চড়কগাছ হয়ে যায়। ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানার শয়নকক্ষে, খাটের নিচে পড়ে ছিল পপুলার স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসার মাথাবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ। এরপর পুরো ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে একপর্যায়ে বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুটির খণ্ডিত মাথা। এই পৈশাচিক দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
গ্রিল কেটে পালালো ঘাতক, স্ত্রী আটক
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সময় ফ্ল্যাটের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন সন্দেহভাজন সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না। তবে পেশায় রিকশা মেকানিক ৩০-৩২ বছর বয়সী সোহেল রানা অপরাধ ঢাকতে বা পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে অত্যন্ত চতুরতার আশ্রয় নেয়। সে ঘরের জানালার লোহার গ্রিল কেটে পেছনের রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যায়।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পল্লবী থানা পুলিশ। অপরাধের আলামত সুরক্ষায় ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের শিকার রামিসা স্থানীয় ‘পপুলার স্কুল’-এর দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। তার এই অকাল ও নির্মম মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এক প্রতিবেশী নারী ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন:
“আমরা ভাবতেও পারছি না আমাদের মাঝে এমন একটা দানব বাস করছিল। শুনলাম সাত বছরের বাচ্চাকে এতটা নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে! এর চেয়ে জঘন্য আর কী হতে পারে? আমরা এই কসাইয়ের ফাঁসি চাই।”
স্থানীয় অন্য এক ব্যক্তি জানান, “ছেলেটা (সোহেল রানা) সম্ভবত কোনো অসৎ বা বিকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে এই কাজ করেছে। এখানে টাকা-পয়সার কোনো লেনদেন বা চুরির বিষয় ছিল না, উদ্দেশ্য অন্যকিছু। তার স্ত্রীকে পুলিশ ধরেছে, কিন্তু সে নিজে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে গেছে। আমরা এর কঠোর বিচার চাই।”
৯৯৯-এ কল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা
নৃশংস এই ঘটনার পর স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল দিলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পল্লবী থানা পুলিশ। পরিস্থিতি বিবেচনা করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন মিরপুর জোনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্পেশাল উইংয়ের সদস্যরা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার সাংবাদিকদের বলেন, “অভিযুক্ত সোহেল রানার বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে৩২ বছর। সে পেশায় একজন রিকশা মেকানিক। আমাদের তদন্ত ও প্রাথমিক আলামত অনুযায়ী, আসামি মোটামুটি আইডেন্টিফায়েড। প্রাথমিকভাবে আমাদের প্রবল ধারণা, সেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে।”
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, শিশুটিকে হত্যার আগে কোনো ধরনের শারীরিক বা পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখতে লাশের ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই নৃশংসতার পেছনের আসল কারণ উদ্ঘাটনে সব ধরনের বৈজ্ঞানিক ও পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে ঘাতক সোহেল রানা গ্রেফতার
পল্লবীর এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গা-ঢাকা দেওয়া সোহেল রানাকে গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযানে নামে পুলিশ। ঢাকা ও এর আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান চালানো হয়। অবশেষে দিন গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে আসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা এলাকায় আত্মগোপন থাকা অবস্থায় ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
ডিসি মোস্তাক সরকার ঘাতক গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, “অভিযুক্তকে মাত্রই গ্রেফতার করা হয়েছে। এখনো আসামিকে বিস্তারিত বা নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি। তাকে ঢাকায় এনে রিমান্ডে নিয়ে সুনির্দিষ্ট জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ও বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি: দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ফাঁসি
একটি অবুঝ শিশুকে এভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না মিরপুরবাসী। ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। রামিসার সহপাঠী ও স্কুলের শিক্ষকরাও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সকলের একটাই দাবি—মামলাটি যেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে অতি দ্রুত ঘাতক সোহেল রানার ফাঁসি কার্যকর করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি করার সাহস না পায় কোনো অপরাধী।






