
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন একটি বহুল পরিচিত ব্র্যান্ড, যেটি নিজেকে “শিশু পুষ্টির সহযোগী” হিসেবে উপস্থাপন করে, তাদের পণ্যে গোপনে রাসায়নিক ব্যবহার, উপাদান গোপন রাখা এবং অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত দুধ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে তখন বিষয়টি শুধু জনস্বাস্থ্য নিয়ে ভয়াবহ এক সতর্ক সংকেত।
সম্প্রতি বগুড়ার সাজাহানপুর উপজেলার বেতগাড়ি এলাকায় পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ অভিযানে “গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেড”-কে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের “শক্তি দই” ও “ফর্টিফাইড টক দই”-এ ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক উপাদান মোড়কে উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে দুধে “টেট্রাসাইক্লিন” ও “বিটা-ল্যাকটাম” শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। এই ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শিশু খাদ্য বিপণনের নৈতিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।
সবচেয়ে আলোচিত উপাদানগুলোর একটি হলো STPP বা Sodium Tripolyphosphate। এটি সাধারণত খাদ্য শিল্পে স্ট্যাবিলাইজার, টেক্সচার উন্নতকারী এবং আর্দ্রতা ধরে রাখতে ব্যবহৃত হয়। কিছু প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে সীমিত পরিমাণে এটি ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও, সমস্যা তৈরি হয় যখন এটি গোপন রাখা হয় কিংবা অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ফসফেট গ্রহণ কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যাদের কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ফসফেট গ্রহণ হাড়ের স্বাস্থ্য ও মিনারেল ব্যালান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগ অনুযায়ী “শক্তি দই”-এ কালার ও ফ্লেভার ব্যবহার করা হলেও তা মোড়কে উল্লেখ করা হয়নি। একজন ভোক্তার অধিকার হলো তিনি কী খাচ্ছেন তা জানা। খাদ্যের লেবেল জনস্বাস্থ্যের তথ্যপত্র। কোনো কোম্পানি যদি উপাদান গোপন রাখে, তাহলে অ্যালার্জি, খাদ্য অসহিষ্ণুতা বা বিশেষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য বাজারজাত পণ্যে এমন গোপনীয়তা নৈতিকভাবেও অগ্রহণযোগ্য।
অভিযানে যে আরেকটি ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে, তা হলো দুধে টেট্রাসাইক্লিন এবং বিটা-ল্যাকটাম অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধ বা দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা না করেই যদি সেই পশুর দুধ বাজারে আসে, তাহলে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ খাদ্যে থেকে যায়।
এটি কেন ভয়ংকর?
কারণ নিয়মিত অল্পমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ মানবদেহে “অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স” তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে গুরুতর সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ নাও করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বহুবার সতর্ক করেছে যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স আগামী দশকের অন্যতম বড় বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনও বিকাশমান।
টেট্রাসাইক্লিন শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের দাঁতের রঙ পরিবর্তন, হাড়ের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া এবং অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে বিটা-ল্যাকটাম গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক অনেকের মধ্যে তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। যাদের পেনিসিলিন অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের জন্য এটি জীবনহানিকরও হতে পারে।
দুঃখজনক বিষয় হলো এই পণ্যগুলোকে “পুষ্টিকর”, “শিশুবান্ধব”, “স্বাস্থ্যকর” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে বাজারজাত করা হয়। বিজ্ঞাপনে দেখানো হয় হাসিখুশি শিশু, সচেতন মা, পুষ্টির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাস্তবে যদি সেই খাদ্যে গোপন রাসায়নিক, অঘোষিত উপাদান এবং অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি থাকে, তাহলে এটি শুধু ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা নয়; এটি বিশ্বাস ভাঙার অপরাধ।
বাংলাদেশে বর্তমানে “ফাংশনাল ফুড” বা “ফর্টিফায়েড ফুড”-এর বাজার দ্রুত বাড়ছে। মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন হচ্ছে, শিশুদের জন্য অতিরিক্ত পুষ্টিগুণ খুঁজছে। এই সুযোগে অনেক প্রতিষ্ঠান “ফর্টিফাইড”, “প্রোবায়োটিক”, “হেলদি” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে নিজেদের পণ্যকে নিরাপদ ও উপকারী হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, “হেলদি” শব্দটি কোনো জাদুকরী সুরক্ষা নয়। একটি খাবার স্বাস্থ্যকর দাবি করলেই সেটি নিরাপদ হয়ে যায় না। বরং এই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন আসে আমাদের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
যদি একটি পরিচিত ব্র্যান্ডের কারখানায় এই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ে, তাহলে ছোট ও অপ্রচলিত কারখানাগুলোর অবস্থা কী? আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাচ্ছি, তার কতটুকু সত্যিই নিরাপদ? শিশুদের টিফিন, সকালের নাশতা কিংবা “পুষ্টিকর” স্ন্যাকস হিসেবে যে পণ্যগুলো আমরা কিনছি, সেগুলোর লেবেল কি আদৌ সত্য বলছে?
এই ঘটনা আমাদের কয়েকটি বিষয় নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
প্রথমত, খাদ্যের লেবেলিং আইন আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো উপাদান গোপন রাখা সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ দরকার। পশুখাদ্য ও দুগ্ধশিল্পে নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
তৃতীয়ত, ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। শুধু বিজ্ঞাপন দেখে নয়, খাদ্যের উপাদান তালিকা পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। “ফর্টিফাইড”, “প্রোবায়োটিক” বা “শিশুদের জন্য বিশেষ” লেখা দেখলেই সেটিকে শতভাগ নিরাপদ ধরে নেওয়া বিপজ্জনক।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের সুস্থতার ওপর। আর শিশুদের খাদ্যে যদি গোপনে রাসায়নিক, অ্যান্টিবায়োটিক এবং অস্বচ্ছতা ঢুকে পড়ে, তাহলে তা শুধু একটি কোম্পানির সমস্যা নয় এটি পুরো জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি অশনি সংকেত।
খাবার শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়। খাবার মানে বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস যখন ভেঙে যায়, তখন জরিমানার অঙ্ক দিয়ে তার ক্ষতি পূরণ হয় না।








