
অনলাইন ডেস্ক, সময়লিপি | ২১ মে, ২০২৬
মানব সভ্যতার ইতিহাস প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। আদিম যুগ, মধ্যযুগ পেরিয়ে মানুষ আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ জয়ের আধুনিক যুগে পদার্পণ করেছে। সময়ের এই আবর্তনে মানুষের তৈরি করা রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক নিয়ম এবং আইনি কাঠামো বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। অতীতে যা প্রগতিশীল মনে হতো, আজ তা অপ্রচলিত বা অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু এই চিরন্তন পরিবর্তনের নিয়মের মাঝেও একটি বিধান সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম, তা হলো মহান আল্লাহ তাআলার দেওয়া জীবনব্যবস্থা বা ইসলাম।
সাম্প্রতিক সময়ে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদ প্রগতির দোহাই দিয়ে আল্লাহর দেওয়া বিধানকে ‘মধ্যযুগীয়’ বা ‘পুরনো’ বলে আখ্যা দেওয়ার অপচেষ্টা চালান। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ এবং বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, আল্লাহর আইন কোনো নির্দিষ্ট যুগের গণ্ডিতে বন্দি নয়; বরং এটি সব যুগের, সব দেশের এবং সব মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য ও কল্যাণকর।
অসীম জ্ঞানের উৎস: কেন আল্লাহর আইন চিরন্তন?
মানুষের তৈরি যেকোনো আইন বা সংবিধানের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো মানুষের সীমিত জ্ঞান। একজন মানুষ বা একদল বিজ্ঞানী যতই মেধাবী হোন না কেন, তারা ভবিষ্যৎ দেখতে পান না। আজ যে আইনকে সমাজ গঠনের জন্য সেরা মনে করা হচ্ছে, আগামী পঞ্চাশ বছর পর তা যুগের চাহিদার সাথে বেমানান হয়ে পড়ে। ফলে সংবিধানে আনতে হয় বারবার সংশোধনী।
পক্ষান্তরে, ইসলামের মূল উৎস হলো পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ, যা অবতীর্ণ হয়েছে নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। আল্লাহর জ্ঞান অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সীমানা পেরিয়ে অসীম। তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব, সমাজের গতিপ্রকৃতি এবং যুগের রূপান্তর সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। তাই তাঁর দেওয়া বিধান কোনো নির্দিষ্ট শতক বা অঞ্চলের জন্য নয়, বরং এটি মানবজাতির জন্য একটি চিরন্তন গাইডলাইন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম।” (সূরা মায়িদাহ: ৩)
মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ ও ইসলামের অপরিবর্তনশীলতা
যুগ যতই আধুনিক হোক না কেন, মানুষের কিছু মৌলিক চাহিদা এবং নৈতিকতার ভিত্তি কখনো পরিবর্তন হয় না। হাজার বছর আগেও মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার, এবং সততার প্রয়োজন ছিল; আজ এই প্রযুক্তির যুগেও তার গুরুত্ব অপরিসীম।
ইসলামের বিধানগুলো মূলত এই মৌলিক মানবিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। উদাহরণস্বরূপ:
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: বর্ণ, গোত্র বা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য সমান আইনি অধিকার নিশ্চিত করেছে ইসলাম।
মানবাধিকার ও দুর্বলদের সুরক্ষা: সমাজ ও পরিবারে নারী, শিশু, এতিম এবং শ্রমিকের অধিকার আদায়ে ইসলামের যে নীতিমালা, তা সর্বজনীন।
অর্থনৈতিক ভারসাম্য: যাকাত ও সুদবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করার যে ফর্মুলা ইসলাম দিয়েছে, তা আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির শোষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
এই বিষয়গুলোকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলে প্রত্যাখ্যান করার অর্থ হলো মানবজাতির মৌলিক কল্যাণকে অস্বীকার করা।
আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ ও ইসলামের নমনীয়তা (Flexibility):
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, চৌদ্দশত বছর আগের আইনি কাঠামো দিয়ে আজকের সাইবার অপরাধ, ক্রিপ্টোকারেন্সি কিংবা জটিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের (যেমন ক্লোনিং বা অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট) সমাধান কীভাবে সম্ভব?
এখানেই ইসলামের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য নিহিত। ইসলামের আইনি কাঠামো বা শরীয়াহ মূলত দুটি অংশে বিভক্ত:
‘আকাইদ ও ইবাদত’ (যা অপরিবর্তনশীল) এবং ‘মুয়ামালাত বা সামাজিক-অর্থনৈতিক লেনদেন’ (যা যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ)। ইসলাম মানবজাতিকে কিছু স্থায়ী মূলনীতি (Principles) দিয়ে দিয়েছে। এই মূলনীতিগুলোর আলোকেই যুগের নতুন নতুন সমস্যার সমাধান করার জন্য ইসলামে ‘ইজতিহাদ’ বা গবেষণার দরজা খোলা রাখা হয়েছে।
ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞরা যুগোপযোগী ইজতিহাদের মাধ্যমে আধুনিক ব্যাংকিং, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিত্যনতুন সমস্যার নিখুঁত সমাধান বের করছেন, যা প্রমাণ করে ইসলাম স্থবির কোনো ধর্ম নয়, বরং এটি একটি গতিশীল জীবনব্যবস্থা।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং ইসলামী বিধানের সামঞ্জস্য:
ইতিহাস সাক্ষী, মধ্যযুগে যখন ইউরোপীয় চ্যাপেল ও চার্চগুলো বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করেছিল, তখন মুসলিম বিজ্ঞানীরা আল্লাহর বিধান ও কুরআনের আলোকেই জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়েছিলেন। কুরআন কোনো বিজ্ঞানের বই নয়, তবে এতে বর্ণিত বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিতগুলো আধুনিক বিজ্ঞানকে প্রতিনিয়ত বিস্মিত করছে। ভ্রূণতত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা থেকে শুরু করে সমুদ্রবিজ্ঞানের বহু সত্য কুরআন শত শত বছর আগেই উন্মোচন করেছে। তাই আল্লাহর বিধানকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারচ্ছন্নতার সাথে তুলনা করা চরম অজ্ঞতা বৈ কিছু নয়। বরং আধুনিক বিজ্ঞান যত উন্নত হচ্ছে, ইসলামের বিধানগুলোর বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা মানুষের কাছে তত বেশি স্পষ্ট হচ্ছে।
শান্তির একমাত্র পথ আল্লাহর বিধান,
পরিশেষে বলা যায়, আধুনিকতার অর্থ কেবল বাহ্যিক চটকদার জীবনধারা বা প্রযুক্তির ব্যবহার নয়। প্রকৃত আধুনিকতা ও প্রগতি হলো একটি বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ সমাজ গঠন করা। মানুষের তৈরি মতবাদগুলো (যেমন পুঁজিবাদ বা সমাজবাদ) মানবজাতিকে পূর্ণ শান্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্বে আজ যে নৈতিক বিপর্যয়, পারিবারিক ভাঙন এবং সামাজিক অশান্তি দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ আল্লাহর দেওয়া চিরন্তন বিধান থেকে দূরে সরে যাওয়া।
আল্লাহর আইন কোনো পশ্চাৎপদ ধারণা নয়, বরং এটি সব যুগের অন্ধকার দূর করার এক কালজয়ী আলোকবর্তিকা। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল একটি আধুনিক, প্রগতিশীল এবং শান্তিপূর্ণ পৃথিবী বিনির্মাণ সম্ভব।
সমায়লিপি/ডেস্ক/RHS








