
স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা
দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর একটি বিশাল মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। প্রাথমিক রূপরেখা অনুযায়ী, এই কারখানাগুলোকে আবার উৎপাদনমুখী করতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল তহবিল, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তার প্যাকেজ নিয়ে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের শিল্প খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এই বিশাল মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারের ওপর সামষ্টিক অর্থনীতির যে চাপ ও অস্বস্তি রয়েছে, তা এই উদ্যোগকে কতটা মসৃণ হতে দেবে—তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কিছুটা সংশয় রয়ে গেছে।
আরও পড়ুন:
মাস্টারপ্ল্যানের মূল লক্ষ্য: উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান
গত কয়েক বছরে নানা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কারণে দেশের বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন কমেছে, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এই স্থবিরতা কাটাতে সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, নতুন কারখানা স্থাপনের চেয়ে বন্ধ থাকা অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উৎপাদন শুরু করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং দ্রুত ফলদায়ক।
সূত্রমতে, এই ৬০ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনার আওতায় প্রধানত তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে:
- আর্থিক প্রণোদনা ও ঋণ পুনর্গঠন: ব্যাংক ঋণের দায়ে বা চলতি মূলধনের অভাবে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোকে বিশেষ শর্তে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা দেওয়া।
- অবকাঠামোগত ও ইউটিলিটি সহায়তা: গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা কারখানাগুলোতে দ্রুত সংযোগ পুনঃস্থাপন করা।
- নীতিগত সংস্কার ও আইনি জটিলতা নিরসন: মালিকানা বা আইনি বিরোধের কারণে যেসব কারখানা বন্ধ রয়েছে, সেগুলো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা।
বিনিয়োগের উৎস ও বণ্টন প্রক্রিয়া
৬০ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল অংকের জোগান কেবল সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP), বিশেষ ব্যাংক তহবিল, এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা। এই সহায়তার একটি বড় অংশ যাবে তৈরি পোশাক (RMG), টেক্সটাইল, চামড়াজাত শিল্প, এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদন খাতের কারখানাগুলোতে, যা দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবে।
আরও পড়ুন:
সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ ও অস্বস্তি: মুদ্রার ওপিঠ
উদ্যোগটি অত্যন্ত ইতিবাচক হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি বাস্তবায়ন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার কারণে এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি কঠিন সময় পার করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের ওপর প্রধানত তিনটি বড় চাপ রয়েছে:
১. ডলার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট: কারখানা সচল করতে হলে অনেক ক্ষেত্রে কাঁচামাল ও নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হবে, যা রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
২. উচ্চ মূল্যস্ফীতি: বাজারে নতুন করে বিশাল অংকের অর্থের জোগান (Money Supply) দিলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. রাজস্ব ঘাটতি: সরকারের নিজস্ব রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম থাকায় এই বিশাল তহবিলের বড় অংশই ব্যাংক ব্যবস্থা বা বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞদের মতামত: সতর্কতা ও সঠিক তদারকির তাগিদ
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এটি বাস্তবায়নে কঠোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।
সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, “বন্ধ কারখানা চালু করার উদ্যোগটি সময়োপযোগী। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, এর আগেও বিভিন্ন সময় প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে, যার একটি বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাব বা অব্যবস্থাপনার কারণে অপব্যবহার হয়েছে। এবার যেন তেমনটি না হয়। প্রকৃত অর্থেই যেসব কারখানা লাভজনকভাবে ফিরে আসার সম্ভাবনা রাখে (Viable Industries), কেবল সেগুলোকেই এই তহবিলের আওতায় আনা উচিত।”
তারা আরও যোগ করেন, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান যে অস্বস্তি, তা কাটাতে হলে কেবল টাকা ঢাললেই হবে না; বরং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার পরিবেশ (Ease of Doing Business) উন্নত করা জরুরি।
আরও পড়ুন:
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সব চ্যালেঞ্জ ছাপিয়ে এই ৬০ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধিতে নতুন জ্বালানি জোগাবে। বিশেষ করে স্থানীয় বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়লে তা আমদানি নির্ভরতা কমাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করবে। দেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সমাজ এখন অপেক্ষা করে আছে এই মেগা পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের দিকে।







