
স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
সাভার: পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানি শেষে কাঁচা চামড়ার প্রধান গন্তব্য এখন ঢাকার সাভার চামড়া শিল্পনগরী (বিসিক ট্যানারি এস্টেট)। কোরবানির পশু জবাইয়ের পর গত তিন দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাভারের ট্যানারিগুলোতে ৫ লাখেরও বেশি পশুর কাঁচা চামড়া এসে পৌঁছেছে। বিশাল পরিমাণের এই চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করতে ট্যানারিগুলোতে তদারকি বহুগুণ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং স্থানীয় প্রশাসন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চামড়ার গুণগত মান বজায় রাখতে ‘লবণ দিয়ে সংরক্ষণ’ প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এবার যাতে কোনোভাবেই চামড়া নষ্ট না হয়, সে জন্য শতভাগ সফলতা নিশ্চিতে ট্যানারিগুলোর ভেতরে ও বাইরে কঠোর মনিটরিং করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
ট্যানারিতে চামড়ার ঢল: লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা
সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় অবস্থিত চামড়া শিল্পনগরী ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের দিন বিকেল থেকেই সাভারে চামড়াবাহী ট্রাক, পিকআপ ভ্যান ও ট্রলি প্রবেশ করতে শুরু করে। প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে ঢাকা ও এর আশেপাশের অঞ্চলের চামড়া বেশি এলেও, তৃতীয় দিনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লবণযুক্ত চামড়াবাহী ভারী ট্রাকের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে ট্যানারির প্রধান সড়কগুলোতে।
ট্যানারি মালিকদের সংগঠন এবং বিসিক সূত্রে জানা গেছে, গত তিন দিনে সাভারের বিভিন্ন ট্যানারিতে ৫ লাখেরও বেশি পশুর চামড়া আনলোড করা হয়েছে। ট্যানারি মালিকরা জানিয়েছেন, চামড়া আসার এই ধারা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। কাঁচা চামড়া কেনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা সহজেই অর্জিত হবে বলে আশা করছেন তারা।
লবণ দিয়ে সংরক্ষণে শতভাগ সফলতার চ্যালেঞ্জ
চামড়া খাতের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় সঠিক সময়ে লবণ না দেওয়ার কারণে। কাঁচা চামড়া ছাড়ানোর পর দ্রুত সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত লবণ না দিলে চামড়া পচে যায় এবং তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির যোগ্যতা হারায়।
বিসিকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান,
“বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আমরা শুরু থেকেই সতর্ক। চামড়া যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য ট্যানারির ভেতরে লবণ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি আমরা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছি। কোনো ট্যানারি যেন গাফিলতি না করে, তা নিশ্চিত করতে বিসিকের একাধিক বিশেষ টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে।”
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবার বাজারে লবণের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় এবং দাম নিয়ন্ত্রণে থাকায় চামড়া সংরক্ষণে বড় কোনো বেগ পেতে হচ্ছে না। তবে গরমের কারণে দ্রুত চামড়ায় লবণ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করাটাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুন:
গত ৩ দিনের চামড়া প্রবেশের এক নজরে চিত্র:
┌───────────────────────────┬──────────────────────────────────┐
│ ঈদের দিন ও পরের দিন │ মূলত ঢাকা ও আশপাশের কাঁচা চামড়া │
│ তৃতীয় দিন │ ঢাকার বাইরের লবণযুক্ত চামড়া │
│ মোট চামড়া প্রবেশ │ ৫ লক্ষাধিক পিস (চলমান) │
└───────────────────────────┴──────────────────────────────────┘
সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (CETP) এর প্রস্তুতি
বিশাল পরিমাণের এই চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে সাভার ট্যানারির কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপির (CETP) ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে। তবে বিসিক কর্তৃপক্ষের দাবি, এবার সিইটিপি সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
ট্যানারি এস্টেটের প্রকৌশল শাখা জানিয়েছে, চামড়া ভেজানো ও ধোয়ার পর যে রাসায়নিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, তা যাতে পরিবেশের ক্ষতি না করে সরাসরি সিইটিপিতে যায়, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্রোমিয়াম পৃথকীকরণ প্ল্যান্টগুলোও সচল রাখা হয়েছে যাতে তরল বর্জ্য শতভাগ শোধন করা সম্ভব হয়।
মাঠ পর্যায়ে কঠোর মনিটরিং ও প্রশাসন
সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা চামড়া নিয়ে চাঁদাবাজি ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ট্যানারির প্রবেশমুখগুলোতে পুলিশি তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে।
পাশাপাশি, চামড়ার সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা এবং ট্যানারিগুলোতে লবণের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিসিকের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স নিয়মিত ট্যানারিগুলো পরিদর্শন করছে। কোনো ট্যানারিতে অব্যবস্থাপনা দেখা গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন:
ট্যানারি মালিকদের বক্তব্য
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) এক শীর্ষ নেতা বলেন, “এবার চামড়ার মান গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশ ভালো। আমরা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চামড়া কিনছি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে হলে আমাদের শতভাগ পরিবেশবান্ধব উপায়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। এজন্য আমরা সরকারের পাশাপাশি নিজেরাও প্রতিটি ট্যানারিতে লবণ দেওয়া এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কড়া নজরদারি রাখছি।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কোরবানির সিংহভাগ চামড়া ট্যানারিগুলোতে প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রাথমিক ধাপ শেষ হবে। যদি এই তদারকি সফলভাবে ধরে রাখা যায়, তবে চলতি বছর চামড়া খাতে লোকসানের কোনো আশঙ্কা থাকবে না, বরং রপ্তানি আয় আরও বৃদ্ধি পাবে।






