
বাংলাদেশে তামাকাসক্তি ও অসংক্রামক রোগের (NCDs) ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এই প্রেক্ষাপটে একটি সহজ কিন্তু অর্থবহ বার্তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে “সিগারেটের বদলে একটি কলা কিনুন।”
শুনতে এটি হয়তো একটি সাধারণ স্লোগান মনে হতে পারে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য গবেষণা বলছে, মানুষের প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণগত পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বড় স্বাস্থ্যগত প্রভাব তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিকর অভ্যাসের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নেওয়া হলে তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
আরও পড়ুন:
তামাক ও অসংক্রামক রোগের দ্বৈত সংকট
বাংলাদেশ বর্তমানে দুটি বড় স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি তামাকের ব্যবহার এবং অসংক্রামক রোগের বৃদ্ধি। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ এখন দেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক কেবল একটি খারাপ অভ্যাস নয়; এটি অকালমৃত্যু, অক্ষমতা এবং আর্থিক চাপের অন্যতম বড় কারণ। একই সঙ্গে ফল ও পুষ্টিকর খাবারের স্বল্প গ্রহণও এসব রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
আরও পড়ুন:
সিগারেট বনাম পুষ্টিকর বিকল্প
চিকিৎসা গবেষণায় দেখা যায়, সিগারেটের নিকোটিন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে সাময়িক স্বস্তি বা মনোযোগের অনুভূতি তৈরি করে। তবে এই অনুভূতি অল্প সময় স্থায়ী হয় এবং ব্যবহারকারী আবারও সিগারেটের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এভাবেই তৈরি হয় আসক্তির চক্র।
অন্যদিকে, একটি কলা শরীরকে সরবরাহ করে ফাইবার, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬ এবং প্রাকৃতিক শক্তি। যদিও এটি কোনো চিকিৎসা নয়, তবে সহজলভ্য ও পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে এটি স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে তামাকের পেছনে নিয়মিত অর্থ ব্যয় পরিবারিক পুষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা পূরণের আগেই সিগারেট কেনার জন্য অর্থ ব্যয় হয়ে যায়।
আরও পড়ুন:
আচরণগত পরিবর্তনের কৌশল
স্বাস্থ্য আচরণ নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ধূমপান কমানো কঠিন। কারণ ধূমপান অনেক সময় মানসিক চাপ, একাকিত্ব বা ক্লান্তির সঙ্গে যুক্ত থাকে।
তাই অনেক জনস্বাস্থ্য উদ্যোগে ধূমপানের বিকল্প হিসেবে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয় যেমন হাঁটা, পানি পান, গভীর শ্বাস নেওয়া বা স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ। “সিগারেটের বদলে কলা” ধারণাটিও সেই ধরনের একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত বার্তা।
আরও পড়ুন:
নীতিগত পদক্ষেপের প্রয়োজন
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমস্যাটির সমাধান কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতার মাধ্যমে সম্ভব নয়। তামাক ব্যবহার কমাতে প্রয়োজন শক্তিশালী নীতিগত পদক্ষেপও।
এর মধ্যে থাকতে পারে
- তামাকজাত পণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ
- প্যাকেটে গ্রাফিক স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা
- বিজ্ঞাপন ও প্রচারণায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ
- ধূমপানমুক্ত জনপরিসর নিশ্চিত করা
- ধূমপান ত্যাগে সহায়তামূলক কাউন্সেলিং ও চিকিৎসা
- পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রাপ্যতা বাড়ানো
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টি নীতিকে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কলা হয়তো নিকোটিন আসক্তি দূর করতে পারবে না। তবে এটি ক্ষতিকর অভ্যাসের ধারাবাহিকতায় একটি বিরতি তৈরি করতে পারে এবং স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সূচনা ঘটাতে পারে।
কারণ অনেক সময় বড় পরিবর্তনের শুরু হয় খুব ছোট একটি সিদ্ধান্ত থেকে হয়তো কোনো চায়ের দোকানে, কোনো মুদি দোকানে, কিংবা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে নেওয়া একটি পছন্দের মধ্যেই।
আর সেই সিদ্ধান্ত হতে পারে সিগারেটের বদলে একটি কলা কেনা।








