
২০২৬ সালের মার্চ মাসের সর্বশেষ সরকারি তথ্য ও বিপিসি (BPC) চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
জ্বালানি তেলের বর্তমান মজুত পরিস্থিতি
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। জ্বালানির ধরন অনুযায়ী কতদিন চলবে তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| জ্বালানির নাম | মজুতকাল (আনুমানিক) | বর্তমান অবস্থা |
| ডিজেল | ১৪ দিন | সন্তোষজনক |
| অকটেন | ২৮ দিন | পর্যাপ্ত |
| পেট্রোল | ১৫ দিন | স্থিতিশীল |
| জেট ফুয়েল | ৫৫ দিন | দীর্ঘমেয়াদী মজুত |
| ফার্নেস অয়েল | ৯৩ দিন | সর্বোচ্চ মজুত |
দ্রষ্টব্য: পেট্রোল এবং অকটেন দেশের ভেতরেই (ইস্টার্ন রিফাইনারি ও অন্যান্য প্ল্যান্টে) উপজাত হিসেবে উৎপাদিত হয়, তাই এগুলোর মজুত নিয়ে বড় ধরনের কোনো শঙ্কার কারণ নেই।
প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৮.৪৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (TCF) উত্তোলনযোগ্য গ্যাস অবশিষ্ট রয়েছে। বর্তমান হারে গ্যাস উত্তোলন ও ব্যবহার চললে:
- দেশীয় এই মজুত আগামী ৫ থেকে ৮ বছর পর্যন্ত চলতে পারে (যদি নতুন কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হয়)।
- বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি এলএনজি (LNG) আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের পদক্ষেপ
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে যাতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য সরকার নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নিয়েছে:
- বিকল্প বাজার: রাশিয়া বা অন্যান্য দেশ থেকে পরিশোধিত তেল আমদানির পথ খোলা রাখা হয়েছে।
- এলসি (LC) খোলা: মার্চ ও এপ্রিল মাসের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির লক্ষ্যে এরই মধ্যে ৩০টিরও বেশি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে।
- নজরদারি: সীমান্তবর্তী এলাকায় জ্বালানি পাচার রোধে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে এবং দেশের ভেতরে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে তদারকি বাড়ানো হয়েছে।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
যদিও বর্তমান মজুত দিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সংকট হবে না, তবে লোহিত সাগর বা হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহে দেরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশে পেট্রোল এবং অকটেন মূলত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (Crude Oil) পরিশোধনের সময় উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে পাওয়া যায়। চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ERL) এবং দেশের বিভিন্ন ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্টে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।
সহজভাবে বলতে গেলে, এটি একটি রান্নার প্রক্রিয়ার মতো যেখানে একটি মূল উপাদান থেকে তাপের তারতম্যে ভিন্ন ভিন্ন জিনিস বেরিয়ে আসে। নিচে এর প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:
আংশিক পাতন বা ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন (Fractional Distillation)
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে যখন বিদেশ থেকে আনা ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল একটি বিশাল টাওয়ারে (Distillation Column) গরম করা হয়, তখন বিভিন্ন তাপমাত্রায় ভিন্ন ভিন্ন পদার্থ আলাদা হয়ে যায়।
পেট্রোল (Gasoline): ক্রুড অয়েলকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে এর একটি অংশ বাষ্পীভূত হয়ে পেট্রোল হিসেবে আলাদা হয়।
অকটেন: পেট্রোলের চেয়ে উচ্চ মানের এবং উচ্চ অক্টেন রেটিং সম্পন্ন অংশটি আলাদাভাবে সংগ্রহ কর

কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন (Condensate Fractionation)
বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় এক ধরণের তরল পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় কনডেনসেট। এই কনডেনসেট হলো পেট্রোল ও অকটেনের প্রধান কাঁচামাল।
- পেট্রোবাংলার অধীনে থাকা বিভিন্ন প্ল্যান্ট এবং বেসরকারি রিফাইনারিগুলো এই কনডেনসেটকে রিফাইন বা শোধন করে।
- শোধন প্রক্রিয়ায় কনডেনসেট থেকে মূলত পেট্রোল এবং সামান্য পরিমাণে ডিজেল ও কেরোসিন উৎপাদিত হয়।
মান উন্নয়ন বা রিফর্মিং (Catalytic Reforming)
সাধারণ পাতন প্রক্রিয়ায় যে পেট্রোল পাওয়া যায়, তার অক্টেন নম্বর বা মান সবসময় গাড়ির ইঞ্জিনের জন্য উপযুক্ত হয় না। তাই ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ক্যাটালিটিক রিফর্মিং ইউনিট (CRU) ব্যবহার করে পেট্রোলের আণবিক গঠন পরিবর্তন করা হয়। এর ফলে নিম্নমানের পেট্রোল উচ্চমানের অকটেন-এ রূপান্তরিত হয়।
উৎপাদন ও সরবরাহের সারসংক্ষেপ:
- পেট্রোল: দেশে উৎপাদিত কনডেনসেট থেকেই আমাদের পেট্রোলের চাহিদার প্রায় ১০০% মেটানো সম্ভব হয়। তাই পেট্রোল সাধারণত আমদানি করতে হয় না।
- অকটেন: দেশে একটি বড় অংশ উৎপাদিত হলেও চাহিদার বাকি অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
- ইস্টার্ন রিফাইনারি: এটি দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় রিফাইনারি যা ক্রুড অয়েল থেকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও জেট ফুয়েল তৈরি করে।








