
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলাদেশের জাতীয় চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা ও দ্রোহের প্রতীক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ ২৫ মে, ২০২৬ থেকে আগামী ২৫ মে, ২০২৭ পর্যন্ত আগামী এক বছর সময়কালকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘নজরুল বছর’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন তিনি। একই সাথে কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালকে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন সরকারপ্রধান।
সোমবার (২৫ মে) সকালে জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ স্মারক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই যুগান্তকারী ঘোষণা দেন। সরকারের এই উদ্যোগকে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গন এবং নজরুলপ্রেমীরা একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
আরও পড়ুন:
বছরব্যাপী উদযাপিত হবে ‘নজরুল বছর’
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম কেবল আমাদের জাতীয় কবিই নন, তিনি আমাদের সংকটে ও সংগ্রামে পরম প্রেরণার উৎস। তাঁর সাম্যবাদ ও দ্রোহের চেতনা আজীবন বাঙালিকে পথ দেখাবে। তরুন প্রজন্মের মাঝে নজরুলের কালজয়ী দর্শন ছড়িয়ে দিতেই আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বছর’ হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।”
সরকারি সূত্রমতে, ২৫ মে ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এই ‘নজরুল বছর’ জুড়েই দেশ ও বিদেশে নানা মাত্রিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে:
- প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত নজরুল সাহিত্যের ব্যাপক প্রচার।
- বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় নজরুলের কবিতা ও গানের অনুবাদ প্রকাশ।
- ডিজিটাল আর্কাইভে নজরুলের সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণ।
- দেশব্যাপী তরুণ প্রজন্মের জন্য ‘নজরুল উৎসব’ ও বিশেষ প্রতিযোগিতার আয়োজন।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এই ‘নজরুল বছর’ সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন:
ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ করার মহাপরিকল্পনা
জাতীয় কবির শৈশবের স্মৃতিধন্য ময়মনসিংহের ত্রিশালকে ঘিরে সরকারের রয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর ভাষণে ত্রিশালকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘নজরুল সিটি’ (Nazrul City) হিসেবে রূপান্তরের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ত্রিশালের সাথে নজরুলের যে আত্মিক সম্পর্ক, তা পৃথিবীবাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা:
ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study) কমিটি গঠন করতে হবে। এই সিটিতে নজরুলের সাহিত্য, সংগীত এবং জীবন দর্শনের ওপর গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা থাকবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ‘নজরুল সিটি’র মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে একটি অত্যাধুনিক নজরুল মিউজিয়াম, আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র, থিম পার্ক এবং সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স। এর ফলে ত্রিশাল কেবল একটি উপজেলা বা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং বিশ্ব দরবারে নজরুল চর্চার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
আরও পড়ুন:
সংস্কৃতি অঙ্গনে আনন্দের জোয়ার
প্রধানমন্ত্রীর এই দ্বিমুখী ঘোষণায় দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও শিক্ষাবিদগণ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে ত্রিশালকে নজরুলের নামানুসারে আরও সুপরিকল্পিতভাবে সাজানোর দাবি জানিয়ে আসছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর ‘নজরুল সিটি’র ঘোষণা আমাদের সেই স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ। আর এক বছর ধরে নজরুল বছর পালন করার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম কবির বৈপ্লবিক মানসিকতা সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পারবে।”
সাধারণ মানুষ এবং নজরুল ভক্তরাও মনে করছেন, এই উদ্যোগের ফলে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের বার্তা বর্তমান সমাজের অস্থিরতা দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন:
নজরুল চর্চায় নতুন দিগন্তের সূচনা
বিশ্লেষকদের মতে, কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকে বিশ্বমঞ্চে সঠিকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অতীতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের কিছুটা ঘাটতি ছিল। তবে ২০২৬-২০২৭ সময়কালকে ‘নজরুল বছর’ হিসেবে ঘোষণা করার মাধ্যমে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে বিদেশি দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নজরুলের সাম্যবাদী ও মানবিক দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার এটাই সুবর্ণ সুযোগ।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেবল ঢাকা বা ত্রিশালেই নয়, কবির স্মৃতিবিজড়িত কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা এবং ভারতের আসানসোলের চুরুলিয়া (কবির জন্মস্থান) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথেও সমন্বয় করে যৌথ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে ‘নজরুল বছর’ ও ‘নজরুল সিটি’র এই জোড়া ঘোষণা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারে।






