
নিজস্ব প্রতিবেদক, লালমনিরহাট:
“আজকের পর আর তামাক চাষ করবো না”— এটি কেবল কোনো সাধারণ মুখের কথা নয়, বরং লালমনিরহাটের শত শত কৃষকের বুক থেকে আসা এক দৃঢ় ওয়াদা বা প্রতিজ্ঞা। উত্তরবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা জেলা লালমনিরহাটে বছরের পর বছর ধরে তামাকের যে জয়জয়কার ছিল, সেখানে এখন বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। তামাকের বিষাক্ত থাবা থেকে নিজেদের জমি, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে তামাক চাষকে চিরতরে ‘না’ বলতে শুরু করেছেন স্থানীয় চাষিরা। বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর নানামুখী প্রলোভন উপেক্ষা করে তারা এখন ঝুঁকছেন পরিবেশ-বান্ধব ও লাভজনক বিকল্প ফসল চাষের দিকে।
যে কারণে তামাক বর্জনের এই অনন্য প্রতিজ্ঞা
লালমনিরহাটের বিভিন্ন উপজেলা, বিশেষ করে হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও কালীগঞ্জের মাঠের পর মাঠ একসময় তামাক পাতায় সবুজ হয়ে থাকত। আপাতদৃষ্টিতে একে লাভজনক মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার সত্যটি এখন কৃষকদের সামনে স্পষ্ট।
স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তামাক চাষের পেছনে হাড়ভাঙা খাটুনি আর বিষাক্ত প্রক্রিয়াকরণ তাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। তামাকের চারা রোপণ থেকে শুরু করে পাতা তোলা, শুকানো বা কিউরিং (Curing) করার প্রতিটি ধাপে পরিবারের শিশু ও নারীসহ সবাইকে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়তে হতো। তামাক ক্ষেতে কাজ করার কারণে কাঁচা পাতার নিকোটিন ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ বা তীব্র বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা এবং শ্বাসকষ্টের মতো রোগের সৃষ্টি করে।
তাছাড়া, তামাক পাতা পোড়ানোর জন্য নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে এলাকার পরিবেশ ও বনায়ন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছিল। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছিল মাটির। তামাক চাষের ফলে জমির উর্বরতা শক্তি এতটাই কমে যাচ্ছিল যে, অন্যান্য খাদ্যশস্য ফলানো কঠিন হয়ে পড়ছিল। এসব নানামুখী ক্ষতি উপলব্ধি করেই কৃষকরা দলবদ্ধভাবে তামাক চাষ ছাড়ার এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও ওয়াদা করছেন।
মাঠ জুড়ে এখন বিকল্প ফসলের হাতছানি
তামাকের বিষ ছেড়ে লালমনিরহাটের কৃষকরা এখন মাঠ রাঙাচ্ছেন সোনালী ভুট্টা, আলু, সরিষা, সূর্যমুখী এবং হরেক রকমের পুষ্টিকর শাকসবজিতে। কৃষি বিভাগের নিরলস উদ্দীপনা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে কৃষকদের মাঝে এই ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
কৃষকরা জানান, আগে তামাক কোম্পানিগুলো অগ্রিম বীজ, সার এবং ফসল কেনার নিশ্চয়তা দিয়ে তাদের তামাক চাষে বাধ্য করত। কিন্তু এখন তারা দেখছেন যে, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুট্টা বা আলু চাষ করলে তামাকের চেয়েও কম পরিশ্রমে এবং কম খরচে দ্বিগুণ লাভ করা সম্ভব। তামাকের মতো দীর্ঘ সময় জমি আটকে থাকে না বলে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলানো যাচ্ছে, যা কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বী করে তুলছে।
সচেতনতা ও সরকারি উদ্যোগের প্রভাব
স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাটে তামাকের আবাদ কমিয়ে খাদ্যশস্য ও অর্থকরী ফসলের উৎপাদন বাড়াতে তারা কৃষকদের নিয়মিত উঠান বৈঠক, প্রশিক্ষণ এবং প্রণোদনা দিয়ে আসছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে উন্নত জাতের বীজ, সার এবং আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণের ফলে কৃষকদের মাঝে বিকল্প ফসল চাষের আগ্রহ বহুগুণ বেড়েছে।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহল কৃষকদের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, লালমনিরহাটের কৃষকদের এই ওয়াদা দেশের অন্যান্য তামাকপ্রবণ অঞ্চলের ( যেমন কুষ্টিয়া, বান্দরবান) চাষিদের জন্য একটি দারুণ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য সরকারের রয়েছে, কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত এই অংশগ্রহণ সেই লক্ষ্য অর্জনকে অনেকখানি সহজ করে দেবে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়
তবে কৃষকরা যেন তাদের এই প্রতিজ্ঞায় অটল থাকতে পারেন, সেজন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। তামাক কোম্পানিগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তারা কৃষকদের পুনরায় তামাক চাষে ফিরিয়ে নিতে নানারকম লোভনীয় অফার বা অগ্রিম দাদন (ঋণ) দেওয়ার চেষ্টা করে। এই আগ্রাসী কৌশলের বিপরীতে কৃষকদের টিকিয়ে রাখতে হলে:
- বিকল্প ফসলের জন্য সহজ শর্তে সরকারি কৃষি ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
- উৎপাদিত ভুট্টা, আলু বা সবজির সঠিক বাজারমূল্য এবং সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার (Cold Storage) সুবিধা বাড়াতে হবে।
- কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে তদারকি আরও জোরদার করতে হবে যাতে কৃষকরা যেকোনো সমস্যায় দ্রুত কারিগরি সহায়তা পান।
লালমনিরহাটের কৃষকদের এই “তামাক আর নয়” ওয়াদা কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি মূলত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনার এক নীরব বিপ্লব। বিষের চাষ ছেড়ে লালমনিরহাটের মাঠ এখন ভরে উঠছে সোনালী ফসলে, যা শুধু কৃষকদের ঘরে সমৃদ্ধিই আনছে না, বরং নিশ্চিত করছে একটি সুস্থ ও সুন্দর আগামী প্রজন্ম। সরকারি-বেসরকারি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে লালমনিরহাটের এই সবুজ বিপ্লব একদিন পুরো দেশকে তামাকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।








