
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবতার সেবায় নিয়োজিত থেকে জীবন উৎসর্গকারী বাংলাদেশের ৬ জন বীর শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড’ (Dag Hammarskjöld Medal) পদকে ভূষিত করেছে জাতিসংঘ। বিশ্বমঞ্চে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা এই বীর সন্তানদের আত্মত্যাগকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে জাতিসংঘ সদর দফতরে আয়োজিত এক জমকালো ও মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে এই পদক তুলে দেওয়া হয়।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেজ নিউইয়র্কে অবস্থিত সংস্থাটির সদর দফতরে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির হাতে এই মর্যাদাপূর্ণ মেডেল তুলে দেন। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
আরও পড়ুন:
বিশ্বশান্তির বেদীতে ৬ বাংলাদেশির আত্মত্যাগ
জাতিসংঘের নীল হেলমেট মাথায় পরে বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের এই ৬ জন বীর সেনানী শাহাদাতবরণ করেন। তাদের এই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগকে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেছে জাতিসংঘ।
মরণোত্তর সম্মাননা পাওয়া বাংলাদেশের এই ৬ জন বীর শান্তিরক্ষী হলেন:
১. মেজর এ কে এম মাহমুদুল হাসান (আফ্রিকার দেশ মালিতে নিয়োজিত জাতিসংঘ মিশন-মিনুসমাতে কর্মরত ছিলেন)
২. ল্যান্স কর্পোরাল মো. মফিজুল ইসলাম (মালিতে শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে শহীদ হন)
৩. ল্যান্স কর্পোরাল মো. শরিফুল ইসলাম (মালি মিশনে বীরত্বের সাথে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গ করেন)
৪. কনস্টেবল মো. জাহাঙ্গীর আলম (হাইতিতে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে নিয়োজিত ছিলেন)
৫. কনস্টেবল মো. জসিম উদ্দিন (কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘ মিশন-মনুস্কোতে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারান)
৬. সৈনিক মো. শরিফ হোসেন (মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘ মিশনে কর্মরত অবস্থায় শহীদ হন)
নোট: শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সময়ে তারা মাইন বিস্ফোরণ, অতর্কিত সশস্ত্র হামলা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে কর্তব্যরত অবস্থায় শাহাদাতবরণ করেন। তাদের এই বীরত্বগাথা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
আরও পড়ুন:
জাতিসংঘ সদর দফতরে আবেগঘন পরিবেশ
পদক প্রদান অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেজ আত্মোৎসর্গকারী শান্তিরক্ষীদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “শান্তিরক্ষীরা যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে নিজেদের জীবন বাজি রাখেন, সেখানে তারা মানবজাতির সর্বোচ্চ রূপটি প্রদর্শন করেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এই বীর সন্তানরা শান্তির জন্য যে মূল্য চুকিয়েছেন, তা বিশ্ববাসী চিরকাল মনে রাখবে।”
মহাসচিব গুতেরেজ বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা ও নিষ্ঠার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বলেন যে, জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের অবদান সবসময়ই অনুকরণীয়।
বাংলাদেশের পক্ষে এই সম্মাননা ও মেডেল গ্রহণ করেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি। পদক গ্রহণের পর এক আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় স্থায়ী প্রতিনিধি বলেন, “এই সম্মাননা যেমন বেদনার, তেমনি অত্যন্ত গৌরবের। আমাদের বীর সন্তানেরা বিশ্বশান্তির জন্য নিজেদের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার এবং দেশের জনগণ এই বীরদের জন্য গর্বিত। টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার সর্বদা অবিচল থাকবে।”
আরও পড়ুন:
ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক কী?
ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক হলো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী শান্তিরক্ষীদের দেওয়া সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক সম্মাননা। জাতিসংঘের দ্বিতীয় মহাসচিব ড্যাগ হ্যামারশোল্ডের স্মরণে এই পদকের নামকরণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে আফ্রিকায় একটি শান্তি মিশনের দায়িত্ব পালনকালে বিমান দুর্ঘটনায় ড্যাগ হ্যামারশোল্ড নিজেও প্রাণ হারিয়েছিলেন।
প্রতি বছর ২৯ মে ‘আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস’ উপলক্ষে পূর্ববর্তী বছরে বা বিভিন্ন সময়ে কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গকারী শান্তিরক্ষীদের এই মরণোত্তর পদক দেওয়া হয়। পদকটিতে শান্তিরক্ষীর নাম, শাহাদাতবরণের তারিখ এবং শান্তিরক্ষায় জাতিসংঘের লোগো খোদাই করা থাকে।
জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের শীর্ষস্থান ও অবদান
বিগত কয়েক দশক ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ পারিশ্রমিক ও সৈন্য প্রেরণকারী দেশ (Troop Contributing Country) হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। ১৯৮৮ সালে প্রথমবার বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী জাতিসংঘের শান্তি মিশনে অংশ নেয়। এরপর থেকে এ পর্যন্ত দেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের হাজার হাজার সদস্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তি ফিরিয়ে আনতে কাজ করেছেন।
নিচে একটি সংক্ষিপ্ত টেবিলের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হলো:
| সূচক | বিবরণ |
| মিশনে অংশগ্রহণ শুরু | ১৯৮৮ সাল |
| মোট অংশগ্রহণকারী দেশ | ৪০টিরও বেশি দেশ |
| বর্তমান অবস্থান | শীর্ষ সৈন্য ও পুলিশ প্রেরণকারী দেশসমূহের অন্যতম |
| সর্বোচ্চ ত্যাগ | এ পর্যন্ত প্রায় ১৬০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জীবন উৎসর্গ করেছেন |
| মূল ভূমিকা | যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ, বেসামরিক নাগরিক রক্ষা, মানবিক সহায়তা এবং পুনর্গঠন |
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের এই সাফল্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মনোবল আরও বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে, এই ৬ বীর সন্তানের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
আরও পড়ুন:
সমাপনী ও রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা
বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে শান্তি প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে বাংলাদেশের তরুণদের এই আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করেছে। শহীদদের এই মরণোত্তর সম্মাননা তাদের শোকার্ত পরিবারগুলোর জন্য কিছুটা হলেও সান্ত্বনা বয়ে আনবে এবং বিশ্ব দরবারে লাল-সবুজের পতাকাকে আরও উঁচুতে তুলে ধরবে। দেশের এই ৬ বীর শান্তিরক্ষীর আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দেশজুড়ে এবং জাতিসংঘে বিশেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে।







