
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মশক নিধনের নামে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বিশেষ করে ফ্লোরিডা যাওয়ার প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, “মশা মারার কৌশল শিখতে ফ্লোরিডা যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কর্মকর্তাদের এসি রুম এবং বিদেশ সফর বাদ দিয়ে সরাসরি দেশের ডোবা, নালা ও ড্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হবে।”
আজ (মঙ্গলবার) সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের জরুরি পর্যালোচনা সভায় তিনি এই নির্দেশনা দেন। দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং মশক নিধন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনায় এই সভার আয়োজন করা হয়।
আরও পড়ুন:
“ফ্লোরিডা নয়, সমাধান দেশের নালা-নর্দমায়”
সভায় প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিবছর মশক নিধনের আধুনিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের মহড়া দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো সুফল দেশের মানুষ পায় না।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন:
“মশা কীভাবে বংশবিস্তার করে আর কোথায় ডিম পাড়ে, তা জানার জন্য ফ্লোরিডার আবহাওয়া দেখার প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশের ডোবা, নালা, আর জমে থাকা ময়লা পানির দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় মশা মারার প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশ ভ্রমণ আর বরদাশত করা হবে না। এখন থেকে কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন হবে তারা কতক্ষণ মাঠপর্যায়ে ছিলেন এবং কতটা এলাকা মশামুক্ত করতে পেরেছেন তার ওপর ভিত্তি করে।”
মাঠপর্যায়ে সরাসরি তদারকির নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শুধু কাগজ-কলমে বা ফাইল কেবিনেটে মশক নিধনের মহাপরিকল্পনা সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের সকল সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রতিদিন ভোরে মাঠে নামতে হবে।
সরাসরি ডোবা ও নালার পাশে দাঁড়িয়ে মশক নিধন কার্যক্রম তদারকি করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, “লার্ভিসাইড ছিটানো এবং ফগিং কার্যক্রম সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা কর্মকর্তারা সশরীরে উপস্থিত থেকে নিশ্চিত করবেন। কোনো এলাকায় মশার ঘনত্ব বাড়লে সংশ্লিষ্ট জোনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করতে হবে।”
আরও পড়ুন:
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৩ দফা বিশেষ পরামর্শ
সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি সমন্বিত ও কার্যকর ক্রাশ প্রোগ্রাম চালুর নির্দেশ দেন। এ সময় তিনি কর্মকর্তাদের জন্য ৩টি বিশেষ পরামর্শ ও নির্দেশনা তুলে ধরেন:
- ১. উৎস নির্মূল ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা: দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডের ডোবা, নালা, পরিত্যক্ত জলাশয় এবং নির্মাণাধীন ভবন চিহ্নিত করে আগামী ৭ দিনের মধ্যে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালাতে হবে। যেখানেই লার্ভা পাওয়া যাবে, সেখানেই কঠোর জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
- ২. জবাবদিহিতা ও বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল: শুধু রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভর না করে গাপ্পি মাছ ছিটানো এবং জৈবিক উপায়ে মশা নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিতে হবে। কাজের স্বচ্ছতার জন্য প্রতিটি এলাকার মশক নিধন কর্মীদের ডিজিটাল হাজিরা ও জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনতে হবে।
- ৩. জনসচেতনতা ও গণমাধ্যম ক্যাম্পেইন: স্কুল, কলেজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে সাথে নিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক সচেতনতা কমিটি গঠন করতে হবে। টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধী বার্তা ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে।
গাফিলতি হলে ওএসডি ও কঠোর ব্যবস্থা
প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, চিকিৎসাসেবা এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে কোনো ধরনের শিথিলতা মেনে নেওয়া হবে না। হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নারগুলোর আধুনিকায়ন এবং পর্যাপ্ত কিট ও স্যালাইন মজুত রাখার নির্দেশ দেন তিনি। একই সাথে মশক নিধন কার্যক্রমে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অবহেলা প্রমাণ হলে তাৎক্ষণিক ওএসডি (Officer on Special Duty) করাসহ বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন:
তিনি বলেন, “জনগণ ট্যাক্স দেয় শান্তিতে ঘুমানোর জন্য এবং সুস্থ থাকার জন্য। মশার কামড়ে মানুষ হাসপাতালে যাবে আর কর্মকর্তারা ফ্লোরিডায় ঘুরবেন—এই সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে।”
উচ্চপর্যায়ের এই পর্যালোচনা সভায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবগণ উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর নির্দেশনার পর ঢাকা সায়েন্স ল্যাব ও স্থানীয় সরকার বিভাগ দ্রুত একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।






