
বিশেষ বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন
স্টাফ রিপোর্টার, সময়লিপি
রংপুর: দেশের মোট জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি ৫৮ লক্ষ ৩০ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী, অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যাই প্রায় ১১ কোটি ৪৪ লাখ। খাতা-কলমে এই বিশাল তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যেকোনো দেশের জন্য এক অবর্ণনীয় শক্তি বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম সত্য হলো—এই বিশাল জনসংখ্যাকে আমরা এখনো প্রকৃত ‘জনশক্তিতে’ রূপান্তর করতে পারিনি। একদিকে কারিগরি দক্ষতার অভাব, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সততার চরম অবক্ষয় আমাদের এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়া ‘নকল’ প্রবণতা এবং পাস-সর্বস্ব শিক্ষানীতি, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক বিশাল ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন:
‘দেখিও না দেখার ভান’: শিক্ষক সমাজের নীরবতা ও সনদের মোহ
বর্তমানে দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই পরীক্ষা কেন্দ্রে এক ধরনের অলিখিত শিথিলতা বা নকলের মহোৎসব লক্ষ্য করা যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকমণ্ডলী বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছেন। এর পেছনে কাজ করছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাসের হার বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের শুধু ‘কাগজের সার্টিফিকেট’ হাতে ধরিয়ে দেওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা।
শিক্ষার্থীরাও এই সস্তা সনদ পেয়ে খুশি মনে ঘরে ফিরছে। তাদের মনে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে—এই কাগজের টুকরোটিই তাদের চাকরি দেবে, টাকা আয়ের পথ সুগম করবে। কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী আনন্দ যখন বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হচ্ছে, তখন শুরু হচ্ছে আসল বিপর্যয়।
চাকরি আছে, কিন্তু দক্ষ ও সৎ প্রার্থীর অভাব
বাস্তব কর্মক্ষেত্রে (Job Sector) গিয়ে এই সনদধারী তরুণরা দেখছে, তাদের এই সনদের কোনো প্রকৃত মূল্য নেই। কারণ, তারা না হয়েছে দক্ষ, না হয়েছে সু-শিক্ষিত।
- চাকরিদাতাদের সংকট: দেশের উদ্যোক্তা ও চাকরিদাতারা প্রতিনিয়ত অভিযোগ করছেন, তারা পদের বিপরীতে হাজার হাজার আবেদন পেলেও কাঙ্ক্ষিত ‘দক্ষ ও সৎ’ ক্যান্ডিডেট পাচ্ছেন না।
- শিক্ষিত বেকারত্ব ও কম বেতন: এই অদক্ষতার কারণেই একদিকে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে যারা চাকরি পাচ্ছে তারাও যোগ্যতা ও দক্ষতার অভাবে আশানুরূপ বেতন (Salary) পাচ্ছে না।
আমরা প্রায়ই বলি, দেশে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব। কিন্তু শুধু প্রতিষ্ঠান বা আধুনিক ‘সৃজনশীল’ প্রশ্নপদ্ধতি এনে এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়, যদি না আমরা শিক্ষার্থীদের ভেতর থেকে সততার এই চরম ঘাটতি দূর করতে পারি।
আরও পড়ুন:
সততার অনুপস্থিতি: সৃজনশীলতা যেখানে মুখ থুবড়ে পড়ে
আমরা যতই নতুন শিক্ষাক্রম বা আধুনিক সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে আসি না কেন, ভেতরের সততা উঠে গেলে সব চেষ্টাই ব্যর্থ হতে বাধ্য। পরীক্ষার হলে বই বা মোবাইল দেখে নকল করে পাস করা একজন শিক্ষার্থী কখনোই নিজের ব্রেন খাটিয়ে নতুন কিছু তৈরি করতে শিখবে না। সততার সহিত নিজের মেধা খাটিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তর লেখার যে আনন্দ ও উপলব্ধি, তা থেকে আজকের প্রজন্ম বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে মেধার বিকাশ থমকে যাচ্ছে প্রথম ধাপেই।
যদি এই শিক্ষার্থীরা সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে শিক্ষকতা কিংবা অন্য যেকোনো পেশায় যোগ দিতো, তবে তাদের মাথায় কোনো ধরনের ‘অনৈতিকতা’ বা অনৈতিকতার চিন্তাও আসতো না। দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে তাই সবার আগে এই শিক্ষাঙ্গনের অনৈতিকতা দূর করতে হবে।
সমাধান কোন পথে? ঘর থেকে শুরু হোক সচেতনতা
এই মহাবিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে এখনই আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। কোনো অজুহাতেই নকলকে আর চোখের আড়াল করা যাবে না।
১. প্রথম ক্লাস থেকেই সচেতনতা: শিক্ষকমণ্ডলীকে অতীতের ভুল ভুলে এখন থেকেই প্রথম ক্লাস থেকে শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে যে, নকল করা শুধু অপরাধ নয়, এটি তাদের নিজেদের জীবনের জন্য এক বিরাট হুমকি।
২. পারিবারিক সচেতনতা ও ঘরে ঘরে বার্তা: এই বার্তাটি শুধু বিদ্যালয়ের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটি ছড়িয়ে দিতে হবে ঘরে ঘরে। প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে যাতে সন্তানরা পারিবারিকভাবেই সততার শিক্ষা নিয়ে গড়ে ওঠে। জিপিএ-৫ বা সনদের চেয়ে নৈতিকতা ও মেধার মূল্যায়ন যে বেশি, তা বাবা-মাকেই আগে বুঝতে হবে।
আরও পড়ুন:
সময়লিপি’র শেষ কথা
জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করার চাবিকাঠি কারিগরি শিক্ষার চেয়েও বেশি লুকিয়ে আছে ‘সৎ ও নৈতিক’ শিক্ষার ওপর। আমরা যদি এখনই এই নীরব মহামারি (নকল ও অনৈতিকতা) না থামাই, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি অন্ধকার গহ্বরে পতিত হবে। আসুন, মুখস্থ আর নকলের সংস্কৃতিকে বিদায় জানিয়ে মেধা ও সততার এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
Rifat/Admin/Post








