
বাংলাদেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হাম (Measles) রোগের সংক্রমণ। আন্তর্জাতিক গবেষক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, কোভিড-পরবর্তী স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিপুলসংখ্যক “জিরো-ডোজ” শিশুর কারণে দেশে হাম রোগ নতুন করে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও হাম নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। কিন্তু নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন, এমআর (Measles-Rubella) ক্যাম্পেইন স্থগিত থাকা এবং কিছু এলাকায় টিকার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে। বর্তমানে দেশের প্রায় সব বিভাগেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েক হাজার রোগীর সংক্রমণ পরীক্ষাগারে নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক সন্দেহভাজন মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগগুলোর একটি। আক্রান্ত একজন ব্যক্তি থেকে সহজেই বহু মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু টিকা নেয়নি বা আংশিক টিকা নিয়েছে, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
আরও পড়ুন:
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত “Measles Resurgence in Bangladesh, 2026” শীর্ষক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ এমআর টিকার কভারেজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর ফলে প্রায় দুই কোটি শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই “জিরো-ডোজ” অর্থাৎ যারা কোনো টিকাই পায়নি।
গবেষকদের তথ্যমতে, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ শিশু কোনো টিকা নেয়নি এবং আরও ১৬ শতাংশ শিশু আংশিক টিকা পেয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আক্রান্তদের একটি বড় অংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এমনকি ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাও সংক্রমিত হচ্ছে, যারা এখনও নিয়মিত টিকা গ্রহণের বয়সে পৌঁছায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে যে ব্যাঘাত তৈরি হয়েছিল, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন সামনে আসছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, মহামারির সময় লাখো শিশু নির্ধারিত সময়ের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়। পরে সেই ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। কিন্তু বর্তমানে অনেক এলাকায় সেই হার প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে গেছে। ফলে “হার্ড ইমিউনিটি” দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন:
ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগে সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকাগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। WHO জানিয়েছে, রাজধানীর ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল ও মিরপুর এলাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক।
এ পরিস্থিতিতে সরকার জরুরি এমআর টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। ইউনিসেফ, WHO এবং গ্যাভির সহায়তায় প্রথম ধাপে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় ক্যাম্পেইন চালু করা হয়েছে। পরে তা ধাপে ধাপে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিনামূল্যে টিকা প্রদান করা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু জরুরি ক্যাম্পেইন নয়, দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি গ্রাম ও শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ টিকাদানে সামান্য ঘাটতিও হাম রোগের মতো সংক্রামক ভাইরাসকে দ্রুত মহামারির আকার দিতে পারে।
আরও পড়ুন:
গবেষকরা আরও সতর্ক করেছেন, হাম রোগ শুধু তাৎক্ষণিক সংক্রমণ নয়; এটি শিশুদের নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কের জটিলতাসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই দ্রুত টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ এবং সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—টিকাবঞ্চিত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা। তা না হলে হাম রোগ আবারও দেশের শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।






