
বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি–মার্চ) জুড়ে অন্তত ১৮৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন শ্রমসংক্রান্ত গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি, যা দেশের শ্রমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (BILS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে অন্তত ১৮৬ শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৩৩৫ জন।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে—
- পরিবহন খাতে সর্বোচ্চ ১০৭ জন নিহত
- কৃষি খাতে ১৯ জন
- নির্মাণ খাতে ১৪ জন
- মৎস্য, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতেও একাধিক মৃত্যু
এই পরিসংখ্যান শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করছে।
আরও পড়ুন:
আগের বছরের তুলনায় বাড়ছে মৃত্যুহার
২০২৫ সালে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল অন্তত ১,১৯০ জন, যা ২০২৪ সালের ৯০৫ জনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এছাড়া অন্য এক জরিপে ২০২৫ সালে ৮০২ জন শ্রমিক নিহত হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
অর্থাৎ, ধারাবাহিকভাবে কয়েক বছর ধরে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুহার ঊর্ধ্বমুখী—
- ২০২৩: প্রায় ১,৪৩২ মৃত্যু
- ২০২৪: ৭৫৮–৯০৫ (বিভিন্ন জরিপে)
- ২০২৫: ৮০২–১,১৯০
- ২০২৬ (প্রথম প্রান্তিক): ১৮৬
এই প্রবণতা শ্রমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
কেন বাড়ছে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু?
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন—
আরও পড়ুন:
১. নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি
অনেক শিল্পকারখানা ও নির্মাণস্থলে যথাযথ সেফটি গিয়ার, প্রশিক্ষণ ও তদারকি নেই।
২. পরিবহন খাতের ঝুঁকি
পরিবহন খাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, যা অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং সড়ক নিরাপত্তাহীনতার ফল।
৩. অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিক্য
বাংলাদেশে অধিকাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে শ্রম আইন বাস্তবায়ন দুর্বল।
৪. অতিরিক্ত কাজের চাপ
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) জানায়, কাজের চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মানসিক চাপও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়—বিশ্বে বছরে ৮ লাখের বেশি মানুষ এ ধরনের ঝুঁকির কারণে মারা যায়।
সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার উদাহরণ
সম্প্রতি চট্টগ্রামে মাটিধসে দুই শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনা আবারও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এ ধরনের দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
আরও পড়ুন:
শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি
শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলো বলছে—
- নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে
- শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে
- দুর্ঘটনার সঠিক তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে
- নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে
সরকারের ভূমিকা ও করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন থাকলেই হবে না—
কার্যকর মনিটরিং, শ্রম পরিদর্শন জোরদার এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
আরও পড়ুন:
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর হার এখনো উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ। ধারাবাহিকভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় এটি কেবল শ্রমিকদের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।






