
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.১৩ শতাংশে—যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশে উঠেছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, তেল ও এলএনজির দামের এই ঊর্ধ্বগতি দেশের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র করবে।
আরও পড়ুন:
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২৫-৪০ শতাংশ বেড়েছে। একসময় ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠলেও সাম্প্রতিক দাম ৯০-১০০ ডলারের আশপাশে। হরমুজ প্রণালির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল-গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর জ্বালানি দেশ হওয়ায় এই ধাক্কা সরাসরি আঘাত করছে। নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ইরান সংকট হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে বিঘ্ন ঘটালে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, “বাংলাদেশের মোট আমদানি ব্যয়ের একটি বড় অংশ জ্বালানি। প্রতি ১০ ডলার তেলের দাম বাড়লে মাসিক আমদানি বিল বাড়বে ৮০ মিলিয়ন ডলার। এটি সরাসরি পরিবহন, উৎপাদন ও খাদ্যের দাম বাড়াবে।” দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম ৭২ ডলার থেকে ১১৯ ডলারে উঠেছে—যা বাংলাদেশের রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করছে।
আরও পড়ুন:
বিবিএস তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। পরিবহন খাতে জ্বালানির খরচ বৃদ্ধি ইতিমধ্যে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়েছে। ট্রাক-বাসের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সবজি-মাছ-চালের দামে প্রভাব ফেলছে। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, “যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র জানায়, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার নিয়ন্ত্রণে রাখছে। তবে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি ফরেক্স রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়াবে। গত তিন বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর যে ধাক্কা সামলাতে পারেনি, এবার ইরান যুদ্ধ তার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
আরও পড়ুন:
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়লে বাস-রিকশার ভাড়া বাড়বে। কৃষকদের সেচ খরচ বৃদ্ধি পাবে, যা খাদ্য উৎপাদন খরচ বাড়াবে। রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়ে প্রতিযোগিতা কমবে।
সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়নি। তবে অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন—জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবহার, বিকল্প উৎস (সৌরশক্তি) বৃদ্ধি এবং আমদানি বৈচিত্র্যকরণ। যুদ্ধ যদি শিগগিরই শেষ না হয়, তাহলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন দ্বিমুখী চাপে—একদিকে যুদ্ধের বৈশ্বিক ধাক্কা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রয়োজন। সাধারণ নাগরিকদের জন্য এটি আরও কঠিন সময়ের সূচনা করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎপরতা এখন অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুন:
(তথ্যসূত্র: বিবিএস, নিক্কেই এশিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, রয়টার্স, আল জাজিরা—১৪ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সর্বশেষ তথ্য অনুসারে)







