
নিজস্ব প্রতিবেদক,
বর্তমান বিশ্বের আধুনিক বিজ্ঞান, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, মহাকাশ গবেষণা কিংবা হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনের ক্যামেরা—এই সবকিছুর গোড়াপত্তন কোথায় হয়েছিল? অনেকেই হয়তো ইউরোপীয় রেনেসাঁ বা পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের নাম জুড়বেন এর সাথে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এক ভিন্ন এবং গৌরবময় সত্য উন্মোচিত হয়। আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে, যখন গোটা ইউরোপ নিমজ্জিত ছিল মধ্যযুগের চরম অন্ধকারে, তখন পৃথিবীর বুকে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছিলেন একঝাঁক মুসলিম বিজ্ঞানী ও মনীষী। অষ্টম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত এই সময়কালকে বলা হয় ‘ইসলামের স্বর্ণযুগ’ (Islamic Golden Age)। এই যুগে বাগদাদ, কর্ডোবা, কায়রো আর দামেস্কের লাইব্রেরি ও গবেষণাগারগুলো থেকে মানবসভ্যতার যে নতুন রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, তারই ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের আধুনিক বিজ্ঞান।
আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব এমন কয়েকজন অবিস্মরণীয় মুসলিম বিজ্ঞানীদের ইতিহাস ও তাঁদের যুগান্তকারী আবিষ্কার নিয়ে, যা ছাড়া আধুনিক পৃথিবীর কথা চিন্তাই করা যায় না।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মুকুটহীন সম্রাট: আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাজি
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে যদি কোনো একজন মানুষের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখতে হয়, তবে তিনি হলেন আল-রাজি (পশ্চিমা বিশ্বে যিনি ‘Rhazes’ নামে পরিচিত)। ৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের রাই নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করা এই মহান মনীষী একাধারে চিকিৎসক, philosopher বা দার্শনিক ও রসায়নবিদ ছিলেন।
আল-রাজির বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা বোঝানোর জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনাই যথেষ্ট। তৎকালীন বাগদাদের খলিফা যখন শহরে একটি আধুনিক ও বড় হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেন, তখন জায়গা নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয় আল-রাজির ওপর। আল-রাজি কোনো তাড়াহুড়ো না করে একটি অনন্য বুদ্ধি খাটালেন। তিনি বাগদাদ শহরের বিভিন্ন মোড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাঁচা মাংসের টুকরো ঝুলিয়ে দিলেন। কয়েকদিন পর তিনি লক্ষ্য করলেন,城市的 অন্য সব জায়গার মাংস দ্রুত পচে গেলেও একটি নির্দিষ্ট এলাকার মাংস তুলনামূলকভাবে অনেক দেরিতে এবং কম পচেছে। আল-রাজি খলিফাকে সেখানেই হাসপাতাল নির্মাণের পরামর্শ দেন, কারণ সেই এলাকার বাতাস ছিল সবচেয়ে বিশুদ্ধ এবং জীবাণুমুক্ত। সংক্রামক ব্যাধি ও পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে এমন আধুনিক চিন্তা আজকের যুগেও বিজ্ঞানীদের চমকে দেয়।
আল-রাজিই ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি যিনি গুটিবসন্ত (Smallpox) এবং হাম (Measles)-এর মধ্যকার সুনির্দিষ্ট পার্থক্য ও লক্ষণসমূহ চিহ্নিত করে বই লিখেছিলেন। তাঁর লেখা ২৩ খণ্ডের বিশাল চিকিৎসা বিশ্বকোষ ‘কিতাব আল-হাভি’ (Kitab al-Hawi) পরবর্তী প্রায় ৫০০ বছর ধরে ইউরোপের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রধান পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাকে আধুনিক পেডিয়াট্রিক্স বা শিশু চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম জনকও বলা হয়।
আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের পিতা: হাসান ইবনে আল-হাইসাম
পদার্থবিজ্ঞান এবং বিশেষ করে আলোকবিজ্ঞান (Optics)-এর ক্ষেত্রে যার অবদান ছাড়া আজকের ক্যামেরা, চশমা, দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা মাইক্রোস্কোপ তৈরি অসম্ভব হতো, তিনি হলেন হাসান ইবনে আল-হাইসাম (ইউরোপে তিনি ‘Alhazen’ নামে পরিচিত)। ৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বসরায় জন্মগ্রহণ করা এই বিজ্ঞানীকে বলা হয় বিশ্বের প্রথম প্রকৃত ‘বিজ্ঞানী’ এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির (Scientific Method) প্রবক্তা।
ইবনে আল-হাইসামের আগে গ্রিক দার্শনিক টলেমি ও ইউক্লিড বিশ্বাস করতেন যে, আমাদের চোখ থেকে এক ধরণের আলো বের হয়ে বস্তুর ওপর পড়ে, আর সে কারণেই আমরা দেখতে পাই। কিন্তু ইবনে আল-হাইসাম এই প্রাচীন ও ভুল তত্ত্বকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দেন। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, আলো যখন কোনো বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এসে প্রবেশ করে, তখনই কেবল আমরা সেই বস্তুটিকে দেখতে পাই।
তাঁর এই যুগান্তকারী পরীক্ষাটি ছিল ‘ক্যামেরা অবস্কিউরা’ (Camera Obscura) বা অন্ধকার ঘরের পরীক্ষা। কায়রোতে একটি অন্ধকার ঘরে বন্দি থাকাকালীন তিনি দেয়ালের একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে বাইরের আলো ভেতরে আসতে দেন এবং লক্ষ্য করেন যে, বাইরের দৃশ্যটি ভেতরের বিপরীত দেয়ালে উল্টোভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। এটিই ছিল পৃথিবীর প্রথম ‘পিনহোল ক্যামেরা’। তাঁর এই মূল নীতির ওপর ভিত্তি করেই আজকের সিনেমা, ডিজিটাল ক্যামেরা এবং প্রজেক্টর তৈরি হয়েছে। তাঁর রচিত ‘কিতাব আল-মানাজির’ (Book of Optics) বিজ্ঞান ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী একটি গ্রন্থ।
বীজগণিতের জনক: আল-খাওয়ারিজমি
কম্পিউটার বা ইন্টারনেটের যুগে ‘অ্যালগরিদম’ (Algorithm) শব্দটি শোনেননি এমন মানুষ কমই আছেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, এই শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে মুসলিম গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি-র নাম থেকে। ৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম নেওয়া এই মহান গণিতবিদকে বলা হয় ‘বীজগণিতের জনক’।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাব আল-জাবর ওয়াল মুকাবিলা’ থেকে আজকের ইংরেজি ‘Algebra’ (অ্যালজেব্রা) শব্দের উৎপত্তি। গ্রিক ও ভারতীয় গণিতকে একত্রিত করে তিনি গণিতশাস্ত্রে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটান। তিনি প্রথম শূন্য (০) এবং দশমিকের ব্যবহারকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। আজকের যুগে আমরা যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা কম্পিউটার কোডিং ব্যবহার করছি, তার মূল ভিত্তি কিন্তু আল-খাওয়ারিজমির তৈরি করা অ্যালগরিদম ও সমীকরণ।
প্রাচ্যের সেতুবন্ধ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইবেল: ইবনে সিনা
ইউরোপে ‘Avicenna’ নামে পরিচিত আবু আলী আল-হুসাইন ইবনে সিনা ছিলেন ইসলামের স্বর্ণযুগের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন। ৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে বুখারার কাছে জন্মগ্রহণ করা এই পলিম্যাথ বা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বিজ্ঞানী মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তৎকালীন সমস্ত বিজ্ঞান ও দর্শনের শাখায় পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন।
ইবনে সিনার সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো ‘আল-কানুন ফিত-তিব্ব’ (The Canon of Medicine)। পাঁচ খণ্ডের এই বিশাল গ্রন্থটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বই বলা চলে। সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের প্রধান প্রধান মেডিকেল কলেজগুলোতে এই বইটিই ছিল মূল পাঠ্য। তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন যে, রোগজীবাণু পানি এবং মাটির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়া কোয়ারেন্টাইন (Quarantine) বা রোগীকে আলাদা রাখার মাধ্যমে যে সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানো রোধ করা যায়, এই ধারণার পেছনেও তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম।
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ পরিমাপক: আল-বিরুনি
আবু রায়হান আল-বিরুনি ছিলেন একাধারে গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ ও ইতিহাসবিদ। আজ থেকে ১০০০ বছর আগে, যখন কোনো আধুনিক স্যাটেলাইট বা টেলিস্কোপ ছিল না, তখন তিনি বর্তমান পাকিস্তানের নন্দনা নামক স্থানে বসে শুধুমাত্র একটি পাহাড়ের উচ্চতা এবং ত্রিকোণমিতিক (Trigonometry) সূত্র ব্যবহার করে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ (Radius) ও পরিধি পরিমাপ করেছিলেন। আধুনিক বিজ্ঞানের পরিমাপের সাথে আল-বিরুনির সেই হিসেবের পার্থক্য ছিল মাত্র ১ শতাংশেরও কম! তাঁর এই অসাধ্য সাধন আজও আধুনিক বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে।
রসায়নের রূপকার: জাবির ইবনে হাইয়ান
রসায়ন বিজ্ঞানকে জাদুটোনা বা কুসংস্কারের হাত থেকে মুক্ত করে পরীক্ষাগারের বাস্তব বিজ্ঞানে রূপান্তর করেছিলেন জাবির ইবনে হাইয়ান (ইউরোপে পরিচিত ‘Geber’ নামে)। ৭২১ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করা এই বিজ্ঞানীকে ‘আধুনিক রসায়নের জনক’ বলা হয়। তিনি তরল পদার্থের পাতন (Distillation), পরিশ্রুতকরণ (Filtration) এবং স্ফটিকীকরণের (Crystallization) মতো মৌলিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াগুলো আবিষ্কার করেন। নাইট্রিক অ্যাসিড, হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড এবং সালফিউরিক অ্যাসিডের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান তিনিই প্রথম প্রস্তুত করেছিলেন।
সভ্যতার ঋণ ও সমাপনী
ইসলামের স্বর্ণযুগের এই বিজ্ঞানীদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা কেবল নিজ ধর্মের অনুসারীদের জন্যই কাজ করেননি, বরং তাঁদের জ্ঞান ছিল সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে নিয়োজিত। বাগদাদের ‘বাইতুল হিকমাহ’ (House of Wisdom)-তে গ্রিক, ভারতীয়, পার্সিয়ান ও মিশরীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানকে আরবী ভাষায় অনুবাদ ও পরিমার্জন করে সংরক্ষণ করা হয়েছিল বলেই আজ প্রাচীন পৃথিবীর বিজ্ঞান হারিয়ে যায়নি।
ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি গড়ে উঠেছিল এই মুসলিম বিজ্ঞানীদের আরবী বইগুলোর ল্যাটিন অনুবাদের ওপর ভর করেই। দুঃখজনকভাবে ইতিহাসের এক বিশাল সময় জুড়ে এই মহান মনীষীদের অবদানকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বর্তমান যুগে নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক ও বিজ্ঞানীরা অকপটে স্বীকার করছেন যে, আল-রাজি, ইবনে আল-হাইসাম, ইবনে সিনা কিংবা আল-খাওয়ারিজমিদের বিজ্ঞান চেতনা ছাড়া আজকের আধুনিক সভ্যতার আলো দেখা অসম্ভব ছিল। নিজেদের গৌরবময় অতীতকে জানা এবং তা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নতুন করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।








