
বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যাপল ইনকর্পোরেটেড-এর জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত। কোম্পানি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে, টিম কুক প্রায় ১৫ বছরের দায়িত্ব শেষে CEO পদ থেকে সরে যাচ্ছেন। স্টিভ জবসের মৃত্যুর পর অ্যাপলকে সবচেয়ে বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব দেওয়া ৬৫ বছর বয়সী এই নেতা তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নির্বাচন করেছেন জন টার্নাসকে — যিনি বর্তমানে অ্যাপলের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট।
জন টার্নাস ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন CEO হিসেবে দায়িত্ব নেবেন, আর টিম কুক Executive Chairman হিসেবে বোর্ডে থেকে কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। অ্যাপলের অফিসিয়াল নিউজরুমে গতকাল প্রকাশিত এই ঘোষণা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি শিল্পে বড় আলোড়ন তুলেছে। বাংলাদেশের প্রযুক্তি উৎসাহী, স্টার্টআপ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ — কারণ আইফোন যেমন দেশের প্রিমিয়াম মার্কেটে জনপ্রিয়, তেমনি অ্যাপলের সার্ভিস ও ইকোসিস্টেমও দ্রুত বাড়ছে।
আরও পড়ুন:
টিম কুক ২০১১ সালে স্টিভ জবসের মৃত্যুর পর CEO হন। তার নেতৃত্বে অ্যাপল একটি প্রিমিয়াম গ্যাজেট নির্মাতা থেকে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস, ভিশন প্রো-এর মতো প্রোডাক্ট চালু হয়েছে। ম্যাক-এ অ্যাপল সিলিকন চিপস আনা, সার্ভিসেস (অ্যাপল মিউজিক, আইক্লাউড, অ্যাপ স্টোর) বৃদ্ধি এবং সাপ্লাই চেইনের দক্ষতা — এসব তার অবদান। গোপনীয়তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও বিশ্বব্যাপী অ্যাক্সেসিবিলিটির ওপর জোর দিয়ে তিনি অ্যাপলের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করেছেন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অ্যাপল ডিভাইস এখনও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
টিম কুক তার আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, “অ্যাপলের CEO হওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য… আমি অ্যাপলকে পুরোপুরি ভালোবাসি।” নতুন CEO জন টার্নাসের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “জন একজন অসাধারণ ইঞ্জিনিয়ার এবং চিন্তাবিদ, যিনি গত ২৫ বছর ধরে আমাদের ব্যবহারকারীদের প্রিয় প্রোডাক্ট তৈরি করে যাচ্ছেন। প্রতিটি বিস্তারিত দিকে তার মনোযোগ, প্রতিটি সম্ভাব্য উন্নয়নে তার আগ্রহ — এটি অসাধারণ। তার হৃদয় ও চরিত্রে রয়েছে অসাধারণ সততা দিয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা।” কুক আশ্বাস দেন যে, টার্নাসের নেতৃত্বে অ্যাপল “অবিশ্বাস্য উচ্চতায়” পৌঁছাবে।
আরও পড়ুন:
জন টার্নাস কে?
৫০ বছর বয়সী ক্যালিফর্নিয়ার এই যান্ত্রিক প্রকৌশলী অ্যাপলের সংস্কৃতির প্রতিফলন। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ গ্র্যাজুয়েশন করা টার্নাস একসময় ভার্সিটি সাঁতার দলে ছিলেন। ২০০১ সালে অ্যাপলে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে উঠে আসেন। তিনি আইপ্যাডের বিকাশ, ম্যাকের কাস্টম সিলিকন ট্রানজিশন এবং বর্তমানে আইফোন, আইপ্যাড, ম্যাক, অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস ও ভিশন প্রো-এর হার্ডওয়্যার দেখাশোনা করছেন।
তিনি নম্র, বিস্তারিত-মনোযোগী এবং সহযোগিতামূলক নেতা হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি হার্ডওয়্যার ও ডিজাইন টিমের দায়িত্ব বাড়ানো হয়েছে তাকে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, অভ্যন্তরীণ এই উত্তরাধিকার নিশ্চিত করবে অ্যাপলের সংস্কৃতিতে কোনো ছেদ পড়বে না।
আরও পড়ুন:
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-তে প্রতিযোগিতা, অ্যাপ স্টোর নিয়ে নিয়ন্ত্রক চাপ, চীন-নির্ভর সাপ্লাই চেইনের ঝুঁকি এবং ভিশন প্রো-এর মূলধারায় আনা — এসব নিয়ে নতুন নেতৃত্বকে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় অ্যাপলের প্রিমিয়াম ডিভাইসের পাশাপাশি সাশ্রয়ী উদ্ভাবন ও স্থানীয় সার্ভিসের দিকেও নজর দিতে পারে নতুন নেতৃত্ব।
ঘোষণার পর অ্যাপলের শেয়ার খুব সামান্য কমলেও বিনিয়োগকারীরা মোটামুটি আস্থাশীল। টিম কুকের Executive Chairman হিসেবে থাকা নিশ্চিত করবে কৌশলগত ধারাবাহিকতা। ২০২৬ সালে অ্যাপলের ৫০তম বার্ষিকীতে এই পরিবর্তন একটি প্রতীকী মুহূর্ত — স্টিভ জবসের সৃজনশীলতা থেকে টিম কুকের অপারেশনাল দক্ষতার পর এবার জন টার্নাসের হাতে অ্যাপলের ভবিষ্যৎ।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশের লাখো আইফোন ব্যবহারকারীদের জন্য এই পরিবর্তন অর্থ ব্যাঘাত নয়, বরং বিবর্তন। নতুন নেতৃত্বের অধীনে অ্যাপল আরও উন্নত প্রোডাক্ট নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। টিম কুকের ভাষায় — “সেরা এখনও বাকি আছে।”








