
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে চীন যেন আজকাল রীতিমতো তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এমন এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটলো যা রোবট প্রযুক্তির সামর্থ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শুধু তৈরি হলো না, বরং ইতিহাস গড়লো চীনের মানবরোবট। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক অর্ধ ম্যারাথনে হিউম্যানয়েড রোবট ‘কুইটিয়ান দাসেং’ (齐天大圣) মাত্র ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে দৌড় শেষ করে। এই সময় মানব রানারদের বিশ্বরেকর্ডের চেয়েও প্রায় ৭ মিনিট দ্রুত, যা রোবট প্রযুক্তিতে এক যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
পিকিংয়ের ই-টাউনে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় শুধু রোবটের জয়ই বড় কথা নয়, বরং গত বছরের তুলনায় তাদের সময় প্রায় দেড় ঘণ্টা কমিয়ে আনা আর মানব দৌড়বিদদের রেকর্ড ভেঙে দেওয়া—এ দুই মাইলফলকই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে।
আরও পড়ুন:
চীনের মানবরোবটের ইতিহাস গড়লো অর্ধ ম্যারাথনে
২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল, পিকিংয়ের ই-টাউনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় মানবরোবট হাফ ম্যারাথন। গত বছর যেখানে চ্যাম্পিয়ন রোবটটি ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট ৪২ সেকেন্ড সময় নিয়ে দৌড় শেষ করেছিল, সেখানে এ বছর তার চেয়েও বেশি উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। এবারের আসরে হুয়াওয়ের সাবসিডিয়ারি অনার কোম্পানি উন্নত ‘কুইটিয়ান দাসেং’ রোবটটি ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।
এমনিতে অর্ধ ম্যারাথনের মানব বিশ্বরেকর্ডটি গত মাসে পর্তুগালের লিসবনে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় উগান্ডার জ্যাকব কিপলিমো ৫৭ মিনিট ২০ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করেছিলেন। সেই হিসেবে এই রোবটটি মানব রেকর্ডের চেয়ে প্রায় ৭ মিনিট দ্রুতগতিতে দৌড় শেষ করে। আর এই সাফল্য শুধু একটি রোবটের নয়, পুরো শিল্পের জন্যই বড় মাইলফলক।
আরও পড়ুন:
প্রযুক্তির লাফালাফি: গত বছর ছিল ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট
বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে হলে গত বছরের দিকে তাকাতে হবে। ২০২৫ সালের প্রথম আসরে সেরা রোবটটি ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সময় নিয়েছিল এবং ২০টি দলের মধ্যে মাত্র ৬টি দৌড় শেষ করতে পেরেছিল। এই বছর অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ১০০টির বেশি দল অংশ নিয়েছে এবং প্রায় ৪০ শতাংশ রোবট সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিতভাবে দৌড় সম্পন্ন করেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, গত বছরের চেয়ে এ বছর রোবটগুলো প্রায় দেড় ঘণ্টা দ্রুত দৌড়াতে পেরেছে।
অনার কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার দু জিয়াওদি জানান, তাদের এই রোবটটি তৈরি করতে প্রায় এক বছর লেগেছে। এতে মানব এলিট রানারদের অনুকরণে ৯০ থেকে ৯৫ সেন্টিমিটার লম্বা পা তৈরি করা হয়েছে এবং স্মার্টফোনে ব্যবহৃত লিকুইড কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
প্রতিযোগিতার নিয়ম ও কৌশলী ব্যবস্থা
এবারের প্রতিযোগিতায় দুটি ক্যাটাগরি ছিল: স্বায়ত্তশাসিত (অটোনোমাস নেভিগেশন) এবং রিমোট কন্ট্রোল। রিমোট কন্ট্রোল রোবটগুলোর সময়কে ১.২ গুণ করে গুণতে হয়েছিল, যাতে স্বায়ত্তশাসিত প্রযুক্তির গুরুত্ব বোঝানো যায়। যদিও দ্রুততম রোবটটি রিমোট কন্ট্রোল ক্যাটাগরিতে ৪৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করেছিল, নিয়ম অনুযায়ী এই সময়কে ১.২ গুণ করে প্রায় ৫৮ মিনিটে পরিণত হয়। ফলে চ্যাম্পিয়ন হয় স্বায়ত্তশাসিত ‘কুইটিয়ান দাসেং’।
পিকিং ই-টাউনের আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে রোবটকে আরও বাস্তবসম্মত ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য করে তোলার জন্যই এই নিয়ম চালু করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
মানব দৌড়বিদদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার চিত্র
ম্যারাথনটিতে ১২ হাজার মানব দৌড়বিদও অংশ নিয়েছিলেন। তারা আলাদা লেনে দৌড়ালেও একই রুট ব্যবহার করেছে। মানব দৌড়বিদদের মধ্যে চীনের ঝাও হাইজিয়ে পুরুষ বিভাগে ১ ঘণ্টা ৭ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড এবং ওয়াং কিয়াওক্সিয়া মহিলা বিভাগে ১ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড সময় নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। অর্থাৎ, রোবট চ্যাম্পিয়ন মানব চ্যাম্পিয়নের চেয়েও প্রায় ১৭ মিনিট দ্রুত দৌড়াতে পেরেছে।
তথ্যসূত্রের দাবি ও যাচাই
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনের তথ্য যাচাইয়ের জন্য একাধিক আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ব্যবহার করা হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমন্ত্রী শিনহুয়া (Xinhua), গ্লোবাল টাইমস, এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এপি, রয়টার্স, নিউইয়র্ক পোস্ট ইত্যাদি সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গত বছরের ফলাফলের সঙ্গে এ বছরের তুলনা ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিবরণ এসব সূত্র থেকে নেওয়া হয়েছে।
রোবট প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ কী বলছে?
এই সাফল্য আসলে কেবল একটি প্রতিযোগিতার জয় নয়, বরং প্রযুক্তির এক বড় অগ্রগতির প্রতীক। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বায়ত্তশাসিতভাবে দৌড়ানো এবং তার মধ্যেই মানব রেকর্ড ভেঙে দেওয়া—এ দুটি বিষয়ই প্রমাণ করে যে রোবট প্রযুক্তি এখন ল্যাবের বাইরে এসে বাস্তব জগতে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে শুরু করেছে।
ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির রোবোটিক্স অধ্যাপক অ্যালান ফার্নের মতে, “এটি কোনো বড় বৈজ্ঞানিক ব্রেকথ্রু নয়, বরং চীনের শক্তিশালী রোবট তৈরির ইকোসিস্টেমের পরিচয় দিচ্ছে।” তবে তিনি স্বীকার করেছেন, যেভাবে চীন দ্রুত মানবরোবটের স্থিতিশীলতা ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, তা সত্যিই চিত্তাকর্ষক।
আরও পড়ুন:
ইউনিট্রি রোবটিকসের এইচ১ রোবটও এই প্রতিযোগিতায় নজর কেড়েছে। তারা ১.৯ কিলোমিটার বাঁকানো পথ ৪ মিনিট ১৩ সেকেন্ডে সম্পন্ন করেছে, যা ১৫০০ মিটার মানব বিশ্বরেকর্ডের গড় গতির চেয়েও বেশি। সংস্থাটির বিপণন পরিচালক হুয়াং জিয়াওইয়ের ভাষ্য, “এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে সামনের দিনগুলোতে রোবটের গতি আরও বাড়বে।”
পরিশেষে
চীনের মানবরোবট ‘কুইটিয়ান দাসেং’-এর এই কীর্তি ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। গত বছর যে রোবটগুলো দৌড় শেষ করতেই হিমশিম খাচ্ছিল, সেগুলো আজ মানব সেরাদের রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছে। এটি শুধু একটি প্রতিযোগিতার ফলাফল নয়, বরং সমগ্র মানবসভ্যতার প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রার এক উজ্জ্বল দলিল। আগামী দিনে এই প্রযুক্তি শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কীরকম প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে বিশ্ববাসীর।








