
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬
বিশ্ব রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্পর্ক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধাবসান এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই সম্ভাব্য ঐতিহাসিক চুক্তির অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে যখন শান্তির এই নতুন সুবাতাস বইছে, ঠিক তখনই ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা আকাশচুম্বী। আজ ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। একই দিনে বৈশ্বিক রাজনীতির এই দুই ভিন্ন মেরুর ঘটনা বিশ্ববাসীকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
আরও পড়ুন:
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি: ট্রাম্পের বড় ঘোষণা
হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (প্রসঙ্গ অনুযায়ী) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান অচলাবস্থা নিরসনে এই বড় অগ্রগতির কথা জানান। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, দুই দেশের কূটনীতিকদের দীর্ঘ আলোচনার পর এই চুক্তিটি এখন স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, “আমরা ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং টেকসই শান্তি চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছি। এই চুক্তি কেবল দুটি দেশের জন্যই নয়, বরং পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে।”
আরও পড়ুন:
উন্মুক্ত হচ্ছে হরমুজ প্রণালি: স্বস্তিতে বিশ্ব অর্থনীতি
এই চুক্তির সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় পুরোপুরি সচল করা। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যকার এই সংকীর্ণ জলপথটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত।
জানার বিষয়: বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। বিগত দিনে ইরান ও মার্কিন সামরিক উত্তেজনার কারণে এই রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছিল, যার প্রভাব পড়েছিল বিশ্ব বাজারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হলে:
- আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল হবে।
- বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন (Supply Chain) পুনরুজ্জীবিত হবে।
- মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে।
চুক্তির নেপথ্যে ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তার ‘ডিল-মেকিং’ বা চুক্তিভিত্তিক কূটনীতির একটি বড় উদাহরণ। ইরানের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং এর বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের মতো শর্ত এই চুক্তিতে থাকতে পারে। যদিও তেহরানের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো যৌথ বিবৃতি আসেনি, তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে—আলোচনা ইতিবাচক পথেই এগোচ্ছে।
আরও পড়ুন:
| বিষয় | সম্ভাব্য চুক্তির প্রভাব |
| জ্বালানি খাত | অপরিশোধিত তেলের দাম কমবে ও সরবরাহ নিশ্চিত হবে। |
| নিরাপত্তা | পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা বাড়বে। |
| অর্থনীতি | নিষেধাজ্ঞা উঠলে ইরানের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। |
অন্যদিকে কিয়েভে রাশিয়ার তাণ্ডব: উত্তপ্ত ইউক্রেন পরিস্থিতি
মধ্যপ্রাচ্যে যখন কূটনীতির জয়গান গাওয়া হচ্ছে, ঠিক তখনই পূর্ব ইউরোপে যুদ্ধের দামামা আরও তীব্র হয়েছে। ইউক্রেনের স্থানীয় প্রশাসনের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, আজ ভোরে রাজধানী কিয়েভসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান জানান, রাশিয়ার বিমান বাহিনী এবং স্থলভাগ থেকে একের পর এক ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ঝাঁকে ঝাঁকে ইরানি প্রযুক্তির ‘শাহেদ’ ড্রোনের সাহায্যেও কিয়েভের আকাশসীমা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
আরও পড়ুন:
হামলার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র:
- কিয়েভের একাধিক বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন।
- শহরের বাসিন্দাদের একটি বড় অংশকে নিরাপদ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে (Bunker) আশ্রয় নিতে হয়েছে।
ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) রাশিয়ার বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে হামলার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, পুরোপুরি ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়নি।
বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বিমুখী হাওয়া
একদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৈরিতা দূর করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা, অন্যদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের এই ভয়াবহ রূপ—বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির এক জটিল বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলছে। ট্রাম্পের এই মেয়াদে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে সফল হচ্ছে, অন্যদিকে ইউক্রেন সংকট সমাধানে ওয়াশিংটন কী ভূমিকা নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
আরও পড়ুন:
আন্তর্জাতিক মহল আশা করছে, হরমুজ প্রণালির সংকটের মতো ইউক্রেন সংকটেও একদিন কূটনীতি জয়ী হবে এবং বিশ্ব দীর্ঘস্থায়ী শান্তির মুখ দেখবে।








