
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কাটিয়ে অবশেষে কি সমঝোতার টেবিলে বসছে ওয়াশিংটন ও তেহরান? বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি আজ সোমবারের মধ্যেই চূড়ান্ত হতে পারে বলে জোরালো ইঙ্গিত মিলেছে। ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে এক হাইপ্রোফাইল সফরে এসে এই আশাবাদের কথা শুনিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ উন্মুক্ত রাখা এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে একটি “কঠিন চুক্তি” (Hard Deal) আজ সোমবারের মধ্যেই সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সমঝোতার চূড়ান্ত মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুটা ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন:
নয়া দিল্লিতে রুবিওর ঐতিহাসিক বার্তা
কূটনৈতিক সফরে বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। নয়া দিল্লিতে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান গোপন ও প্রকাশ্য আলোচনার অগ্রগতি তুলে ধরেন। রুবিও বলেন, “আমরা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কিন্তু ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছি। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তবে আজ সোমবারের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করা সম্ভব। এই চুক্তি কেবল দুটি দেশের জন্য নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় মাইলফলক হবে।”
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও স্পষ্ট করেন যে, এই চুক্তিটি কোনো শিথিল সমঝোতা নয়, বরং এটি একটি ‘কঠিন চুক্তি’। এর মাধ্যমে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের রাশ টেনে ধরার পাশাপাশি তেহরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের একটি রূপরেখা তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন:
মূল ফোকাস: হরমুজ প্রণালী ও মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরকে সংযুক্তকারী কৌশলগত জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। বিগত বছরগুলোতে ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়লেই এই প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বা জব্দের মতো ঘটনা ঘটেছে, যা বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল।
মার্কো রুবিও নিশ্চিত করেছেন যে, নতুন চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো হরমুজ প্রণালীকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা। এর বিনিময়ে ইরান তাদের থমকে যাওয়া অর্থনীতিকে সচল করার জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে বড় ধরনের ছাড় পেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইয়েমেনের হুথি, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং গাজা উপত্যকায় চলমান উত্তেজনার আবহে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফেরাতে এই চুক্তিটি গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করতে পারে।
আরও পড়ুন:
ট্রাম্পের ‘ধীরে চলো’ নীতি এবং সতর্কতা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আজ সোমবারই চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী হলেও, ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ মহলে কিছুটা সতর্কতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি নিয়ে অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো না করার জন্য তাঁর প্রশাসনকে পরামর্শ দিয়েছেন।
হোয়াইট হাউস সূত্রের খবর, ডোনাল্ড ট্রাম্প চান চুক্তির প্রতিটি ধারা যেন নিখুঁত এবং আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের পক্ষে শতভাগ অনুকূলে থাকে। অতীতে ইরানের সাথে হওয়া পরমাণু চুক্তি (JCPOA) থেকে ট্রাম্প নিজেই ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, তৎকালীন চুক্তিটি আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করতে পারেনি। ফলে এবার ট্রাম্প প্রশাসন কোনো ফাঁকফোকর রাখতে চাইছে না। ট্রাম্পের এই সতর্ক অবস্থানের কারণে চুক্তিটি আজ চূড়ান্ত হলেও এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
বৈশ্বিক রাজনীতি ও ভারতের ভূমিকা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি দেওয়ার জন্য ভারতের মাটিকে বেছে নেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। ভারতের সাথে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশেরই সুসম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়নে ভারত বড় বিনিয়োগ করেছে, আবার আমেরিকার ‘কোয়াড’ (QUAD) জোটেরও অন্যতম প্রধান অংশীদার নয়াদিল্লি।
নয়াদিল্লির কূটনৈতিক মহল মনে করছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং মধ্য এশিয়ায় ভারতের বাণিজ্য পথ আরও সুগম হবে। ফলে এই চুক্তির পেছনে ভারতেরও একটি পরোক্ষ মধ্যস্থতাকারী বা সহায়কের ভূমিকা থাকতে পারে।
আরও পড়ুন:
আগামী কয়েক ঘণ্টায় নজর বিশ্ববাসীর
আজ সোমবার দিনভর ওয়াশিংটন, তেহরান এবং নয়া দিল্লির কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো ব্যস্ত সময় পার করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া এই ‘ডেডলাইন’ যদি সত্যি হয়, তবে তা হবে চলতি দশকের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, তেহরানের কট্টরপন্থী নেতৃত্ব মার্কিন প্রশাসনের এই ‘কঠিন চুক্তি’র শর্তগুলো পুরোপুরি মেনে নেবে কি না। অন্যদিকে, মার্কিন কংগ্রেসের অভ্যন্তরেও ইরানের সাথে যেকোনো চুক্তির বিরোধিতা করার মতো লবি সক্রিয় রয়েছে। সব বাধা পেরিয়ে আজই কি হোয়াইট হাউস থেকে আসবে সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা, নাকি ট্রাম্পের সতর্কবার্তায় ঝুলে থাকবে আলোচনা—তা দেখার জন্য আগামী কয়েক ঘণ্টা গভীর নজর থাকবে বিশ্ববাসীর।








