
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা—বিশেষ করে সুনামগঞ্জ—দেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদন কেন্দ্র। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থা এবং অতিবৃষ্টির ফলে এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নতুন সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। এতে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল হুমকির মুখে পড়েছে, কৃষকরা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।
আরও পড়ুন:
জলাবদ্ধতার কারণ: অপরিকল্পিত বাঁধ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা
স্থানীয় কৃষক, বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, হাওর অঞ্চলে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত ফসল রক্ষা বাঁধ এখন উল্টো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বাঁধ প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে, ফলে পানি আটকে থেকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, হাওরের ভেতরে নদী-নালা ও খালগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং বৃষ্টির পানি সহজে বের হতে পারছে না। এছাড়া কোথাও কোথাও বাঁধের সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন:
বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক জলাবদ্ধতা
২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে অতিবৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। প্রশাসনের তথ্যমতে, একাধিক হাওরে পানি জমে কৃষিজমি তলিয়ে গেছে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে জরুরি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিশেষ করে দেখার হাওরে প্রায় ১,২০০ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে চলে যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, কৃষকরা নিজেরাই বাঁধ কেটে পানি বের করার চেষ্টা করেন।
আরও পড়ুন:
কৃষকের ক্ষতি ও সামাজিক প্রভাব
জলাবদ্ধতার কারণে সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন হাওরে অন্তত ১,১৮৯ হেক্টর বোরো ধান আক্রান্ত হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।
এতে কৃষকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক সংকটও তৈরি হচ্ছে।
- অনেক কৃষক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন
- খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে
- স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
একাধিক এলাকায় কৃষকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে বাঁধ কাটা নিয়ে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে।
আরও পড়ুন:
স্থানীয় উদ্যোগ বনাম প্রশাসনিক বাধা
জলাবদ্ধতা নিরসনে অনেক কৃষক নিজ উদ্যোগে পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়া বাঁধ কাটার সুযোগ নেই, ফলে দ্রুত সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না।
এছাড়া কোথাও কোথাও কৃষকরা পানি বের করার জন্য অস্থায়ী নালা তৈরি করলেও পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, ফলে জলাবদ্ধতা আরও বেড়েছে।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওর অঞ্চলে প্রতি বছর একই পদ্ধতিতে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও কৃষির জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।
তাদের মতে—
- প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে
- নদী-খাল পুনঃখনন জরুরি
- বৈজ্ঞানিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে
সম্ভাব্য সমাধান
আরও পড়ুন:
হাওর অঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা:
- সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা
পুরো হাওর অঞ্চলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে। - নদী ও খাল পুনঃখনন
পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে নদী-নালার নাব্যতা বাড়াতে হবে। - বাঁধ নির্মাণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানে বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে এবং বিদ্যমান বাঁধগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। - পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো উন্নয়ন
স্লুইস গেট, পাম্পিং স্টেশনসহ আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। - স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ
পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কৃষকদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
হাওর অঞ্চলের জলাবদ্ধতা এখন শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে।
যদি দ্রুত সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে দেশের খাদ্য উৎপাদনের একটি বড় অংশ ঝুঁকির মুখে পড়বে—যার প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতেও।






