
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ।।
যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো অঙ্গরাজ্যে একটি সামরিক বিমান প্রদর্শনী (এয়ার শো) চলাকালীন মাঝআকাশে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের মধ্যে ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রোববার (১৭ মে) স্থানীয় সময় বিকেলে আইডাহোর ‘মাউন্টেন হোম এয়ার ফোর্স বেসে’ আয়োজিত ‘গানফাইটার স্কাইজ এয়ার শো’ চলাকালে এই হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে।
সংঘর্ষের পর যুদ্ধবিমান দুটি তীব্র গতিতে মাটিতে আছড়ে পড়ে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়। তবে অত্যন্ত স্বস্তির বিষয় হলো, বিমানে থাকা মোট চারজন ক্রুর (পাইলট ও কর্মকর্তা) সবাই এজেকশন সিস্টেমের মাধ্যমে প্যারাশুটের সাহায্যে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
যেভাবে ঘটল এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা
সিবিএস-এর স্থানীয় সহযোগী চ্যানেল ‘কোমো নিউজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনাকবলিত বিমান দুটি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অত্যন্ত শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক ‘ইএ-১৮জি গ্রাউলার’ (EA-18G Growler) মডেলের যুদ্ধবিমান ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাউন্টেন হোম এয়ার ফোর্স বেসের উত্তর-পশ্চিমে প্রায় দুই মাইল দূরে আকাশে কসরত দেখানোর সময় বিমান দুটির মধ্যে এই মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া দুর্ঘটনার বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, মাঝআকাশে তীব্র গতিতে থাকা বিমান দুটির মধ্যে আচমকা সংঘর্ষ হয়। আঘাত লাগার সাথে সাথেই বিমান দুটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাড়া নিচের দিকে পড়তে থাকে। মাটিতে আছড়ে পড়ার মুহূর্তেই সেখানে একটি বিশাল এবং ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো দুর্ঘটনাস্থল ও চারপাশের আকাশ কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ঢেকে যায়।
তবে এই ভয়াবহতার মধ্যেই অলৌকিক ও স্বস্তিদায়ক দৃশ্যটি দেখা যায় আকাশের ওপরের অংশে। সংঘর্ষের ঠিক পরপরই বিমান দুটি মাটিতে পড়ার আগেই ভেতরের চারজন ক্রু অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিজেদের ইজেক্ট করতে সক্ষম হন। ভিডিওতে তাদের প্যারাশুট নিয়ে ধীরে ধীরে অক্ষত অবস্থায় নিচে নেমে আসতে দেখা যায়।
উদ্ধার অভিযান ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ
দুর্ঘটনাটি ঘটার পরপরই মাউন্টেন হোম এয়ার ফোর্স বেসের বিশেষ জরুরি উদ্ধারকারী ও অগ্নিনির্বাপক দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সামরিক ঘাঁটির মুখপাত্ররা জানিয়েছেন, জরুরি দলগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সাথে উদ্ধার কাজ শুরু করে এবং ক্রুদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। ৪ জন ক্রু-ই বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত আছেন বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মুখপাত্র কমান্ডার অ্যামেলিয়া উমায়াম এক বিবৃতিতে দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বিধ্বস্ত হওয়া ইএ-১৮জি গ্রাউলার যুদ্ধবিমানগুলো ওয়াশিংটনের ‘হুইডবি আইল্যান্ড’ ঘাঁটিভিত্তিক একটি বিশেষ স্কোয়াড্রনের অংশ ছিল। এয়ার শো-তে অংশ নিতেই তারা আইডাহোর এই ঘাঁটিতে এসেছিল।
এয়ার শো বাতিল ও কঠোর লকডাউন
মার্কিন আরেক শীর্ষ সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ভয়াবহ ঘটনার পর চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এয়ার শো দেখতে আসা হাজারো দর্শকের মধ্যে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে ‘গানফাইটার স্কাইজ এয়ার শো’-র বাকি সব কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়।
একই সাথে পুরো সামরিক ঘাঁটিতে কঠোর লকডাউন জারি করে জনসাধারণের প্রবেশ ও চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সামরিক কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কি না কিংবা পাইলটদের মধ্যে সমন্বয়ের কোনো অভাব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ইএ-১৮জি গ্রাউলার’ মূলত একটি বিশেষায়িত ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিমান, যা শত্রুর রাডার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা জ্যাম বা নিষ্ক্রিয় করতে ব্যবহৃত হয়। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সংবেদনশীল এই দুটি যুদ্ধবিমানের ধ্বংস হয়ে যাওয়া মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য একটি বড় ক্ষতি। তবে কোনো ধরনের প্রাণহানি না হওয়াকে প্রযুক্তির আধুনিকতা ও ক্রুদের তাৎক্ষণিক সঠিক সিদ্ধান্তের বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য প্রকাশ করা হবে না বলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।








