
অনলাইন ডেস্ক ||
আফগানিস্তানের ইসলামিক আমিরাত সরকার নারীর অধিকার রক্ষায় এবং সামাজিক কুপ্রথা বন্ধে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছে। নতুন এক বিশেষ ডিক্রি বা ফরমানের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, এখন থেকে কোনো মেয়ের সম্মতি ছাড়া তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া যাবে না। যদি কোনো পরিবার বা গোষ্ঠী এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায়, তবে ভুক্তভোগী নারী সরাসরি আদালতে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন এবং সেই বিয়ে সম্পূর্ণ বাতিল করার আইনি অধিকার পাবেন।
ইসলামিক আমিরাতের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “মেয়ের সম্মতি তার মৌলিক ও ধর্মীয় অধিকার, এবং কেউ তার থেকে এই অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না।”
ডিক্রিতে যা বলা হয়েছে
ইসলামিক আমিরাতের সুপ্রিম কোর্ট ও বিচার মন্ত্রণালয়ের যৌথ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিয়েতে কনের (কন্যার) স্পষ্ট এবং স্বাধীন সম্মতি থাকা বাধ্যতামূলক। জোর করে, ভয় দেখিয়ে বা পারিবারিক চাপে পড়ে কোনো নারীর বিয়ে দেওয়া হলে তা ইসলামি শরিয়াহ এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অবৈধ বলে গণ্য হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়:
- কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে তার অমতে বিয়ে দেওয়া যাবে না।
- পারিবারিক শত্রুতার জের ধরে বা কোনো বিরোধ মীমাংসার অংশ হিসেবে মেয়েদের ‘বিনিময়’ বা জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া (যা স্থানীয়ভাবে ‘বাদ’ প্রথা নামে পরিচিত) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- বিধবা নারীদের পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রেও তাদের নিজস্ব মতামতকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। শ্বশুরবাড়ির কেউ জোর করে কোনো দেবর বা ভাসুরের সাথে তাদের বিয়ে দিতে পারবে না।
আদালতে অভিযোগ ও বিয়ে বাতিলের প্রক্রিয়া
নতুন এই ডিক্রি জারির পর আফগানিস্তানের বিচার ব্যবস্থার ওপর বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এখন থেকে কোনো নারী যদি অভিযোগ করেন যে তার বিয়ে জোরপূর্বক হয়েছে, তবে স্থানীয় আদালতগুলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেই মামলার শুনানি করতে হবে।
যদি প্রমাণিত হয় যে বিয়েতে কনের সম্মতি ছিল না, তবে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে সেই বিয়ে বাতিল (Annulment) ঘোষণা করবেন। একই সাথে, যারা এই জোরপূর্বক বিয়ের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে—তা সে পরিবারের সদস্য হোক বা কোনো মধ্যস্থতাকারী—তাদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ইসলামিক আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে দেশের সকল মসজিদের ইমাম এবং কাজী বা নিকাহ রেজিস্টারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা বিয়ের খুতবা পড়ানোর আগে কনের সম্মতি সরাসরি এবং কোনো রকম চাপমুক্ত পরিবেশে গ্রহণ করেন।
ইসলামিক শরিয়াহর প্রতিফলন
ইসলামিক আমিরাতের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কোনো নতুন আইন নয়, বরং ইসলামি শরিয়াহর প্রকৃত ও সঠিক রূপরেখা। ইসলাম নারীকে তার জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার এবং বিয়েতে সম্মতি বা অসম্মতি জানানোর পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা কিছু গোত্রীয় বা আঞ্চলিক কুপ্রথার কারণে নারীরা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। এই ডিক্রির মাধ্যমে সেই সব কুপ্রথার চিরতরে অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মানবাধিকার ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ডিক্রি কার্যকর হলে দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। এর ফলে বাল্যবিয়ে এবং জোরপূর্বক বিয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। আফগান সমাজের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সাধারণ মানুষের মতে, এটি নারীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পারিবারিক জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনবে।
আদালতকে এই বিষয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ায় ভুক্তভোগী নারীরা এখন আইনি সুরক্ষার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হতে পারবেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রত্যন্ত জেলাগুলোতেও যেন নারীরা সহজে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন, সে জন্য বিশেষ সেল বা হেল্পডেস্ক গঠন করার পরিকল্পনা চলছে।
এক নজরে নতুন ডিক্রির মূল দিকগুলো
| প্রধান বিষয় | নতুন নির্দেশনা ও আইনি সুরক্ষাকবচ |
| নারীর সম্মতি | বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার জন্য কনের স্পষ্ট সম্মতি বাধ্যতামূলক। |
| আদালতের ভূমিকা | জোরপূর্বক বিয়ের বিরুদ্ধে নারীরা সরাসরি অভিযোগ করতে পারবেন এবং আদালত বিয়ে বাতিল করতে পারবেন। |
| কুপ্রথা বন্ধ | পারিবারিক বিরোধ মেটাতে মেয়েদের পণ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রথা নিষিদ্ধ। |
| বিধবাদের অধিকার | স্বামী মারা যাওয়ার পর বিধবা নারী নিজের ইচ্ছানুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন, কেউ জোর করতে পারবে না। |
| শাস্তির বিধান | জোরপূর্বক বিয়েতে বাধ্যকারী অভিভাবক বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা। |
ইসলামিক আমিরাতের এই ঘোষণা দেশটির আইনি ও সামাজিক ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক। “মেয়ের সম্মতি তার অধিকার”—এই নীতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীদের সুরক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। এখন দেখার বিষয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এই ডিক্রি কতটা কঠোরভাবে এবং সফলতার সাথে বাস্তবায়ন করা হয়।








