
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ডিয়েগো শহরের সবচেয়ে বড় মসজিদে এক ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার সকালের এই হামলায় মসজিদের এক বীর নিরাপত্তাকর্মীসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, সামরিক পোশাক পরিহিত দুই কিশোর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। পরবর্তীতে তারা নিজেদের গাড়ির ভেতরেই গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করে। ভয়াবহ এই ঘটনার পর পুরো ক্যালিফোর্নিয়াজুড়ে গভীর শোক ও স্তব্ধতা নেমে এসেছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
সোমবার সকালে হামলার ঘটনার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে থেকেই ক্যালিফোর্নিয়া পুলিশ এক কিশোরের সন্ধান করছিল। তার মা পুলিশকে জানিয়েছিলেন যে, তার ছেলে বাড়ি থেকে তার (মায়ের) কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং গাড়ি নিয়ে পালিয়ে গেছে। ওই কিশোরের মা আশঙ্কা করছিলেন তার ছেলে আত্মহত্যাপ্রবণ হতে পারে। মায়ের দাবি অনুযায়ী, তার ছেলের সাথে আরও এক কিশোর ছিল এবং তারা দুজনেই সামরিক পোশাকের মতো ক্যামোফ্লাজ (Camouflage) পোশাক পরে বের হয়েছিল।
পুলিশ যখন ওই কিশোরের মায়ের সাথে কথা বলছিল, ঠিক তখনই সান ডিয়েগো শহরের ইসলামিক সেন্টার মসজিদে গুলির খবর আসে। কাকতালীয়ভাবে, ঘটনার সময় পুলিশ কর্মকর্তারা ওই মায়ের সাথে মসজিদ থেকে মাত্র কয়েক ব্লক দূরে অবস্থান করছিলেন।
মসজিদে হামলা ও বীর নিরাপত্তাকর্মীর আত্মত্যাগ
সকাল ১১টা ৪৩ মিনিটে সান ডিয়েগো পুলিশ প্রথম মসজিদে পৌঁছায়। সেখানে তারা মসজিদের মূল ভবনের সামনে তিনজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত দেখতে পান। নিহতদের মধ্যে মসজিদের একজন নিরাপত্তাকর্মীও ছিলেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিহত ওই নিরাপত্তাকর্মী নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে সাহসিকতার সঙ্গে বন্দুকধারীদের রুখে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তার এই বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কারণে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এবং রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে। সান ডিয়েগো পুলিশের প্রধান স্কট ওয়াহ্ল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “তার কাজ ছিল সত্যিই বীরত্বপূর্ণ। আজ তিনি নিঃসন্দেহেই অনেকের জীবন বাঁচিয়েছেন।”
কর্তৃপক্ষ এখনো নিহতদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে সিবিএস নিউজকে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, নিহত ওই বীর নিরাপত্তাকর্মী আট সন্তানের বাবা ছিলেন।
দ্বিতীয় স্থানে হামলা ও হামলাকারীদের আত্মহত্যা
মসজিদে তাণ্ডব চালানোর কিছুক্ষণ পরেই নিকটবর্তী আরেকটি এলাকায় চলন্ত গাড়ি থেকে গুলি চালানোর খবর পায় পুলিশ। বন্দুকধারীরা সেখানে এক ল্যান্ডস্কেপ কর্মীকে (বাগান ও পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণকারী) লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তবে সৌভাগ্যবশত ওই কর্মী প্রাণে বেঁচে যান। ধারণা করা হচ্ছে, গুলিটি সরাসরি তার নিরাপত্তা হেলমেটে লেগে ছিটকে বেরিয়ে যায়।
এর পরপরই ঘটনাস্থল থেকে কয়েক ব্লক দূরে একটি সন্দেহভাজন গাড়ির ভেতর থেকে ১৭ ও ১৮ বছর বয়সী দুই কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কর্মকর্তাদের ধারণা, পুলিশি অভিযানের মুখে পড়ে তারা নিজেরাই নিজেদের গুলি করে আত্মহত্যা করেছে। পুলিশ প্রধান স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই অভিযানে পুলিশকে কোনো গুলি চালাতে হয়নি।
হামলার পেছনে ঘৃণাজনিত অপরাধের ইঙ্গিত
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে সান ডিয়েগো কাউন্টির সবচেয়ে বড় মসজিদকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং সন্দেহভাজনদের একজনের রেখে যাওয়া সুইসাইড নোটের কারণে ঘটনাটিকে ‘ঘৃণাজনিত অপরাধ’ (Hate Crime) বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল বলেন, উদ্ধারকৃত নোটে “সাধারণ ঘৃণামূলক বক্তব্য ও বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা” পাওয়া গেছে। তবে ওই নোটে মসজিদ বা সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো হুমকি ছিল না। তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ সন্দেহভাজনদের একজনের স্কুলে এবং একটি শপিং মলে অভিযান চালিয়েছে, যেখানে তাদের গাড়িটি দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই (FBI) এই ঘটনার তদন্তে নেমেছে এবং সাধারণ মানুষের কাছে তথ্য চেয়েছে।
আতঙ্কের মুখে শিশুরা
যে সময় এই হামলার ঘটনা ঘটে, তখন মসজিদ প্রাঙ্গণে অনেক শিশু উপস্থিত ছিল। কারণ এই ইসলামিক সেন্টারের ভেতরেই ‘আল রশিদ স্কুল’ নামে একটি ধর্মীয় ও ভাষা শিক্ষার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। হামলার পরপরই পুলিশ দ্রুত মসজিদের কক্ষগুলোতে তল্লাশি শুরু করে এবং নিরাপত্তা প্রটোকল মেনে শিশুদের উদ্ধার কাজ শুরু করে। আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা শিশুদের হাত ধরে পার্কিং এলাকা দিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। ঘটনার পর আশপাশের সব স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি আধা-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের প্রায় ৩০টি গুলির বিকট শব্দ শুনেছেন। প্রথমে টানা এক ডজন গুলি এবং কিছুটা বিরতি দিয়ে আবার গুলির শব্দ শোনা যায়। ঘটনার সময় ৯িলে কল করা এক অবসরপ্রাপ্ত স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “ছুটির দিনে এখানে অনেক মানুষের সমাগম হয়। ভাগ্য ভালো যে ঘটনাটি শুক্রবারে ঘটেনি, তাহলে হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তো।”
তীব্র নিন্দা ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
পবিত্র ঈদুল আযহার প্রস্তুতির প্রাক্কালে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর এমন হামলায় তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সান ডিয়েগো ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক তাহা হাসান এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এটি একটি উপাসনালয়, কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়।”
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গাভিন নিউসম এক বিবৃতিতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “ইসলামিক সেন্টারে আজকের এই সহিংস হামলায় আমি আতঙ্কিত। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে পরিবার ও শিশুরা জড়ো হয় এবং মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে উপাসনা করে।” তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী হামলা বা ভয়ভীতি সৃষ্টির ঘটনা ক্যালিফোর্নিয়া সরকার বরদাশত করবে না।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার হোয়াইট হাউজের এক অনুষ্ঠানে এই বন্দুক হামলাকে “ভয়াবহ পরিস্থিতি” বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “ঘটনাটি সম্পর্কে আমাকে প্রাথমিক তথ্য জানানো হয়েছে। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখবো।”








