
অনলাইন ডেস্ক || ২৪ মে, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুদ্ধাবস্থার মধ্যেই হঠাৎ ইরান সফরে গিয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান। অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ এই সফরে তিনি বর্তমানে ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থান করছেন। বিশ্বস্ত কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি বিশেষ শান্তি প্রস্তাব এবং যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী নিয়ে ইরানের নীতি-নির্ধারক ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে তার নিবিড় আলোচনা চলছে।
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের এই তেহরান সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। অনেকেই ধারণা করছেন, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং সাম্প্রতিক সংঘাতময় পরিস্থিতি শান্ত করতে পাকিস্তান এখানে একটি অনানুষ্ঠানিক ‘যোগাযোগ মাধ্যম’ বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।
আরও পড়ুন:
বৈঠকের মূল এজেন্ডা: মার্কিন শান্তি প্রস্তাব ও যুদ্ধবিরতি
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, পাক সেনাপ্রধানের এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি ফিরিয়ে আনা। বেশ কিছুদিন ধরেই ওই অঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং ছায়াযুদ্ধের কারণে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র একটি খসড়া শান্তি প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৈঠকে মূলত যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে:
- আঞ্চলিক হামলা বন্ধের শর্ত: মার্কিন প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরানের মদদপুষ্ট আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ করার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে কী ধরনের ছাড় দেওয়া হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা।
- অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ: যদি ইরান এই যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী মেনে নেয়, তবে দেশটির ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আংশিক বা সাময়িকভাবে শিথিল করার একটি প্রলোভন বা প্রস্তাব এই প্যাকেজে থাকতে পারে।
- লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথগুলোতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ইরানের প্রতিশ্রুতি আদায় করাও এই আলোচনার অন্যতম এজেন্ডা।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা কেন?
প্রশ্ন উঠতে পারে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই জটিল সমীকরণে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান কেন ভূমিকা রাখছেন? কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কৌশলগত কারণ রয়েছে:
১. ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক: ইরানের সাথে পাকিস্তানের সুদীর্ঘ সীমান্ত এবং ঐতিহাসিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সাথে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তেহরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একটি কার্যকর যোগাযোগ সবসময়ই বজায় থাকে।
২. যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক অংশীদারিত্ব: পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগী। ফলে, ওয়াশিংটন যখন সরাসরি ইরানের সাথে টেবিলে বসতে পারে না, তখন ইসলামাবাদের সামরিক নেতৃত্বকে বার্তা বাহক হিসেবে ব্যবহার করা সুবিধাজনক হয়।
3. নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লাগলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ওমান উপসাগরে অস্থিরতা পাকিস্তানের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখা ইসলামাবাদের নিজস্ব স্বার্থেরই অংশ।
আরও পড়ুন:
ইরানের নীতি-নির্ধারকদের অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া
তেহরানের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের মাধ্যমে আসা মার্কিন বার্তাটি ইরান অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করছে। তবে ইরানের নীতি-নির্ধারকদের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্তাবলীর ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না।
ইরানের পক্ষ থেকে বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যেকোনো ধরনের স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বা শান্তি প্রস্তাব কার্যকর করতে হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিদেশি (মার্কিন) সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। তবে তেহরান আলোচনার টেবিল থেকে একবারে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি, যা কূটনীতির ভাষায় একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতামত ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মিশনটি সফল হওয়া বা না হওয়া অনেকটাই নির্ভর করছে পর্দার পিছনের চুক্তির ওপর।
“যদি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের এই তেহরান সফর সফল হয় এবং ইরান মার্কিন প্রস্তাবের কিছু শর্তেও রাজি হয়, তবে তা হবে বর্তমান দশকের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য। এটি মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে রক্ষা করতে পারে।” — আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
আরও পড়ুন:
তবে এই ধরনের গোপন বা ব্যাক-চ্যানেল কূটনীতিতে চটজলদি কোনো ফলাফল আশা করা ভুল হবে। তেহরানের বৈঠকের পর পাক সেনাপ্রধান ওয়াশিংটন বা তার মিত্রদের সাথে পুনরায় যোগাযোগ করবেন কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
পরবর্তী দিনগুলোতে এই আলোচনার অগ্রগতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে এর কী প্রভাব পড়ে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে বিশ্ব সম্প্রদায়।








