
স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা
জুন মাসের শুরুতেই সাধারণ ভোক্তাদের জন্য কিছুটা অস্বস্তির খবর নিয়ে এলো বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। সরকারের আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ‘স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি’র আওতায় জুন মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এই সমন্বয়ে দেশের বাজারে প্রতি লিটার পেট্রোল ও অকটেনের দাম একলাফে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বহুল ব্যবহৃত ডিজেল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
আজ (১ জুন) মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এই নতুন মূল্য তালিকা ঘোষণা করা হয়, যা আজ মধ্যরাত থেকেই দেশব্যাপী কার্যকর হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
এক নজরে জ্বালানি তেলের নতুন ও পুরাতন মূল্য তালিকা:
ভোক্তাদের সুবিধার্থে জুন মাসের সংশোধিত মূল্য নিচে টেবিল আকারে দেওয়া হলো:
| জ্বালানি তেলের প্রকার | পূর্ববর্তী মূল্য (প্রতি লিটার) | জুন মাসের নতুন মূল্য (প্রতি লিটার) | দামের পরিবর্তন (লিটার প্রতি) |
| পেট্রোল | ১৩৫ টাকা | ১৪০ টাকা | ⬆️ ৫ টাকা বৃদ্ধি |
| অকটেন | ১৪০ টাকা | ১৪৫ টাকা | ⬆️ ৫ টাকা বৃদ্ধি |
| ডিজেল | ১১৫ টাকা | ১১৫ টাকা | 🔄 অপরিবর্তিত |
| কেরোসিন | ১১৫ টাকা | ১১৫ টাকা | 🔄 অপরিবর্তিত |
কেন বাড়লো পেট্রোল ও অকটেনের দাম?
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসেই এই দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় দেশীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল এবং রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে ব্যবহৃত এই দুই জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির গ্রাহকেরা সরাসরি আর্থিক চাপের মুখে পড়বেন।
মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
“ফর্মুলা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে দেশের বাজারের দামের ব্যবধান কমাতে এই ৫ টাকা সমন্বয় করা হয়েছে। তবে সরকার চেয়েছে সাধারণ মানুষ ও কৃষিখাতে যেন এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।”
আরও পড়ুন:
স্বস্তিতে গণপরিবহন: অপরিবর্তিত ডিজেলের দাম
পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়লেও দেশের সিংহভাগ গণপরিবহন, পণ্যবাহী ট্রাক এবং কৃষি সেচ পাম্পে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম ১১৫ টাকাই রাখা হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন পরিবহন মালিক ও সাধারণ যাত্রীরা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডিজেলের দাম বাড়লে বাস ও ট্রাক ভাড়া বাড়ার সরাসরি অজুহাত পান পরিবহন চালকেরা। যার চেইন রিঅ্যাকশন হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আরও একদফা বেড়ে যায়। জুনের এই সমন্বয়ে ডিজেলকে স্পর্শ না করায় আপাতত গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ার কোনো আইনি সুযোগ থাকছে না, যা সাধারণ স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য একটি বড় স্বস্তি।
গ্রাহক ও বাজার সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
নতুন এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার পর রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কাওরান বাজার ও কল্যাণপুর এলাকার কয়েকটি পাম্প ঘুরে দেখা যায়, ঘোষণার পরপরই পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন পড়ে গেছে।
মোটরসাইকেল চালক আরিফুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এমনিতেই বাজারে সব জিনিসের দাম চড়া। তার ওপর যদি প্রতি লিটার পেট্রোলে ৫ টাকা করে বাড়ে, তবে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত, যারা রাইড শেয়ারিং বা প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করি, তাদের আয়ের একটা বড় অংশই তেলের পেছনে চলে যাবে।”
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর এক প্রতিনিধি জানান, যদিও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা প্রশংসনীয়, তবুও পেট্রোল ও অকটেনের দাম বৃদ্ধি পরোক্ষভাবে সেবামূলক খাতের ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও দ্রুত তা কার্যকর করা।
আরও পড়ুন:
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কী?
আইএমএফ (IMF)-এর ঋণ শর্তের অংশ এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে চলতি বছরের শুরু থেকেই বাংলাদেশে প্রতিমাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের এই স্বয়ংক্রিয় বা ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। প্রতি মাসের শেষে বা শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারের গড় দাম, আমদানি শুল্ক, ফ্রেইট চার্জ এবং ডলার রেটের ওপর ভিত্তি করে একটি গাণিতিক সূত্রের সাহায্যে পরবর্তী মাসের দাম নির্ধারণ করা হয়। ফলে বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশে কমে এবং বিশ্ববাজারে বাড়লে দেশেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।
চলতি জুন মাসের এই নতুন দর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে। দেশজুড়ে সব ফিলিং স্টেশনকে এই নতুন মূল্য তালিকা মেনে তেল বিক্রির নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)।






