
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের ধকল থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করতে বড় ধরনের বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এবার নিজস্ব খনি থেকে গ্যাস ও তেল উত্তোলনে জোর দেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের গভীর ও অগভীর সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র (ইন্টারন্যাশনাল বিডিং) আহ্বান করা হয়েছে।
এবারের দরপত্রে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে (IOC) আকৃষ্ট করতে উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির (PSC) শর্তাবলীতে আমূল পরিবর্তন এনে গ্যাসের মূল্য পুনর্বিবেচনা ও সংশোধন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নতুন এই আকর্ষণীয় শর্তের কারণে বিশ্বখ্যাত জ্বালানি জায়ান্ট কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের সমুদ্রে বিনিয়োগ করতে সাগ্রহে এগিয়ে আসবে।
আরও পড়ুন:
কেন এই জরুরি দরপত্র?
জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে গ্যাসের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গত কয়েক মাস ধরে দেশের শিল্পাঞ্চল থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। একদিকে ডলার সংকটের কারণে উচ্চমূল্যে এলএনজি (LNG) এবং জ্বালানি তেল আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি উপায় হলো বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় লুকিয়ে থাকা নিজস্ব খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার। আর সে লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে দক্ষ ও আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় শর্ত ও গ্যাসের মূল্য সংশোধন
বিগত বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও গ্যাসের কম মূল্য নির্ধারণ এবং কঠোর শর্তের কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
“এবার মডেল পিএসসি (Model PSC) বা উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি এমনভাবে সংশোধন করা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের ব্রেন্ট ক্রুডের (Brent Crude) মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গ্যাসের দাম ওঠানামা করবে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে কোম্পানিগুলো তাদের উত্তোলিত গ্যাসের জন্য বাড়তি ও যৌক্তিক মূল্য পাবে।”
নতুন সংশোধিত চুক্তি অনুযায়ী:
- উন্মুক্ত মূল্য নির্ধারণ: গ্যাসের বেস প্রাইজ বা ভিত্তি মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে লিংকড থাকবে।
- কর রেয়াত ও মুনাফা স্থানান্তর: বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য শুল্কমুক্ত যন্ত্রপাতি আমদানি এবং লভ্যাংশ সহজে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুবিধা থাকছে।
- ঝুঁকি হ্রাস: গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে শতভাগ ঝুঁকি বহুজাতিক কোম্পানি বহন করলেও সফল হলে লাভের অংশীদারিত্বের অনুপাত এবার অনেক বেশি আকর্ষণীয় করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
কোন কোন ব্লকে চলবে অনুসন্ধান?
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরের মোট ২৪টি ব্লকে এই অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
১. অগভীর সমুদ্রের (Shallow Water) ব্লক: ৯টি
২. গভীর সমুদ্রের (Deep Water) ব্লক: ১৫টি
বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস হাইড্রেট বা মিথেন গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমার তাদের সমুদ্রসীমায় বিশাল গ্যাসের খনি আবিষ্কার করে তা উত্তোলন শুরু করলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে ছিল। এই দরপত্রের মাধ্যমে সেই দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী মহলের প্রতিক্রিয়া
সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা, তবে তারা দ্রুত চুক্তি সম্পাদন ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদদের মতে, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। আজ দরপত্র আহ্বান করলে অনুসন্ধান শেষ করে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আসতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ বছর সময় লাগতে পারে। তাই বর্তমান সংকট কাটাতে এলএনজি আমদানির পাশাপাশি এই দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানের কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চালাতে হবে।
এদিকে দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, কলকারখানায় গ্যাসের চাপের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যদি দ্রুত সাগরে গ্যাস পাওয়া যায়, তবে দেশের শিল্প খাত পুনরুজ্জীবিত হবে এবং বিদেশি ডলারের ওপর নির্ভরতা কমবে।
আরও পড়ুন:
সংকট উত্তরণের মহাসড়কে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশ বর্তমানে তার মোট চাহিদার একটি বড় অংশ গ্যাস ও তেল আমদানি করে মেটায়। এই আমদানিনির্ভরতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে যদি দেশের সমুদ্রসীমা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস আবিষ্কার করা সম্ভব হয়, তবে বাংলাদেশ কেবল জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণই হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হবে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দরপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হবে এবং চলতি বছরের শেষভাগের মধ্যেই যোগ্য কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন করে সমুদ্রে ত্রিমাত্রিক (3D) সিসমিক সার্ভে ও কূপ খননের কাজ শুরু করা যাবে।
জ্বালানি সংকট কাটাতে এবং দেশকে লোডশেডিংমুক্ত করতে এই মেগা প্রকল্প কতটা সফল হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।






