
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
টানা সাতদিনের দীর্ঘ ঈদুল ফিতরের ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটি শেষে আজ সোমবার থেকে চিরচেনা রূপে ফিরছে দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। সকাল থেকেই রাজধানীসহ সারাদেশের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা এবং পুঁজিবাজারে (শেয়ারবাজার) পুরোদমে শুরু হয়েছে সাধারণ লেনদেন ও দাপ্তরিক কার্যক্রম।
সকাল থেকেই মতিঝিল, দিলকুশা, কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ ছুটির পর প্রথম কার্যদিবস হওয়ায় গ্রাহকদের ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই ঈদের আগে বকেয়া থাকা জরুরি আর্থিক লেনদেন সারতে সকাল সকালই ব্যাংকের শাখাগুলোতে ভিড় জমান।
আরও পড়ুন:
স্বাভাবিক সূচিতে ফিরলো ব্যাংকিং লেনদেন
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আজ সোমবার থেকে ব্যাংকের অফিসিয়াল ও লেনদেনের সময়সূচি আগের স্বাভাবিক নিয়মে ফিরেছে। রমজান মাসে রোজাদারদের সুবিধার্থে ব্যাংকিং লেনদেনের সময় কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছিল। তবে ঈদ পরবর্তী প্রথম কার্যদিবস থেকেই গ্রাহকরা আগের নিয়মে সকাল ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যাংকিং লেনদেন করতে পারছেন। আর ব্যাংকের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের অফিস সময় নির্ধারণ করা হয়েছে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা ঘুরে দেখা গেছে, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ঈদের আমেজ কাটেনি পুরোপুরি। কর্মস্থলে যোগ দিয়ে তারা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। তবে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি গ্রাহকসেবা দিতে কোনো ধরনের ঢিলেমি দেখা যায়নি। ক্যাশ কাউন্টার ও ড্রপ বক্সগুলোতে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন থাকলেও ব্যাংক কর্মীরা দ্রুত সেবা নিশ্চিত করছেন।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদের ছুটির কারণে সাধারণ ও বাণিজ্যিক লেনদেন দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। তবে এই সময়ে অনলাইন ব্যাংকিং, এটিএম বুথ এবং মোবাইল আর্থিক সেবা (MFS) চালু থাকায় গ্রাহকদের খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয়নি। তবুও বড় অংকের ক্যাশ লেনদেন, এলসি (LC) খোলা এবং ড্রিপোজিট বা ঋণের কিস্তি জমা দেওয়ার জন্য প্রথম দিনেই গ্রাহকের চাপ কিছুটা বেশি।
আরও পড়ুন:
চাঙ্গা হতে শুরু করেছে শেয়ারবাজার
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আজ সকাল থেকেই দেশের দুই পুঁজিবাজার—ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরু হয়েছে। ঈদের ছুটির আগে বাজারের যে মন্দাভাব বা স্থবিরতা দেখা গিয়েছিল, ছুটি শেষে প্রথম দিনেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
পুঁজিবাজারের লেনদেনও আজ থেকে আগের স্বাভাবিক সূচিতে ফিরে এসেছে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত মূল কার্যদিবসের লেনদেন চলছে, এবং এরপর পরবর্তী ১০ মিনিট (দুপুর ২টা ২০ থেকে ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত) পোস্ট-ক্লোজিং সেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রমজান মাসে শেয়ারবাজারের লেনদেনের সময় আধঘণ্টা কমিয়ে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত করা হয়েছিল, যা আজ থেকে বাতিল হয়েছে।
ডিএসই’র একাধিক ব্রোকারেজ হাউজ ঘুরে দেখা গেছে, ছুটির পর প্রথম দিন হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী সশরীরে হাউজে এসেছেন। আবার অনেকেই মুঠোফোনে বা অনলাইনের মাধ্যমে তাদের পোর্টফোলিও পর্যবেক্ষণ করছেন। বাজার সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ঈদের দীর্ঘ ছুটি শেষে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাজারে নতুন তহবিল নিয়ে প্রবেশ করবেন, যা আগামী দিনগুলোতে সূচক ও লেনদেনের পরিমাণ বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন:
বিমা খাতেও কর্মচঞ্চলতা
দেশের লাইফ ও নন-লাইফ বিমা কোম্পানিগুলোর অফিসও আজ সোমবার থেকে পূর্ণ উদ্যমে খোলা হয়েছে। সকাল থেকেই কোম্পানিগুলোর প্রধান কার্যালয়সহ শাখা অফিসগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে যোগ দিয়েছেন। ঈদের কারণে ঝুলে থাকা বিভিন্ন বিমা পলিসির দাবি নিষ্পত্তি এবং নতুন পলিসি খোলার বিষয়ে গ্রাহক ও এজেন্টদের মধ্যে কর্মব্যস্ততা দেখা গেছে। বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ (IDRA)-র নির্দেশনা অনুযায়ী সব বিমা কোম্পানি তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেছে।
ঈদের দীর্ঘ ছুটির প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, এবারের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সরকারি ছুটির পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে টানা দীর্ঘ ছুটি ছিল। ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী ঈদের মূল ছুটি, সাপ্তাহিক ছুটি (শুক্রবার ও শনিবার) এবং শবে কদরের ছুটি মিলিয়ে টানা ৭ দিন বন্ধ ছিল দেশের অর্থনৈতিক খাত।
দীর্ঘ এই ছুটির কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের সাময়িক বিরতি এসেছিল। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আজ ব্যাংক ও শেয়ারবাজার খোলায় দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে আবার গতি সঞ্চার হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “দীর্ঘ ছুটির পর প্রথম দিনে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা চাপ থাকে। তবে আমাদের অনলাইন ক্লিয়ারিং হাউজ এবং রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (RTGS) ব্যবস্থা পুরোপুরি সক্রিয় থাকায় আন্তঃব্যাংক লেনদেনে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমরা আশা করছি দু-একদিনের মধ্যে পরিস্থিতি একদম স্বাভাবিক হয়ে আসবে।”
আরও পড়ুন:
সব মিলিয়ে, ঈদের আমেজ কাটিয়ে আবারো ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অঙ্গন। ব্যাংক, বিমা ও শেয়ারবাজারের এই স্বাভাবিক পথচলা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও বেগবান করবে—এমনটাই প্রত্যাশা ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের।






