
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান শুরুর ১৭তম দিনে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে। ইরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক সেজিল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে দাবি করেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে এই ক্ষেপণাস্ত্র তেল আভিভসহ বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। একইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী খুলে রাখতে আন্তর্জাতিক যুদ্ধজাহাজের জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
আরও পড়ুন:
যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি
ফেব্রুয়ারি ২৮ থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ বা ‘রোরিং লায়ন’-এ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ও সামরিক অবকাঠামোতে হাজারো হামলা চালিয়েছে। ইরানের সাবেক সুপ্রিম লিডার আলি খামেনির মৃত্যুর পর নতুন নেতৃত্বের অধীনে তেহরান প্রতিশোধমূলক হামলা অব্যাহত রেখেছে। আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস) জানিয়েছে, গত ১৭ দিনে তারা প্রায় ৭০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩,৬০০টি ড্রোন ছুড়েছে।
সোমবার (১৬ মার্চ) ইরান প্রথমবার সেজিল-২ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। এটি সলিড-ফুয়েল, দুই-ধাপের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, যা সনাক্ত করা কঠিন এবং আয়রন ডোমসহ উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম। ইরান দাবি করেছে, এই হামলায় ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি ও কমান্ড সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র আটকানো হয়েছে, তবে তেল আভিভ ও হাইফায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বাহিনী গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানে ২০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, আগামী তিন সপ্তাহে হাজারো হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালী নিয়ে জোর
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখে তাহলে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ প্রায় সাতটি দেশ যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। তিনি বলেছেন, “যেসব দেশ তেল আমদানি করে, তাদেরই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করবে।” ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার হরমুজ প্রণালী ‘শত্রু ট্যাঙ্কারের’ জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন, যা বিশ্ব তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ প্রভাবিত করছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি সংকটের ধাক্কা
হরমুজ প্রণালীতে সংকটের কারণে তেলের দাম আকাশছোঁয়া। বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দেশের ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর। সরকার ইউনিভার্সিটি বন্ধ, জ্বালানি রেশনিং এবং দৈনিক সরবরাহ সীমিত করেছে। পেট্রোল স্টেশনে লম্বা লাইন, প্যানিক বাইং এবং কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (SANEM)-এর বিশ্লেষণ অনুসারে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জিডিপি ১.২ থেকে ৩ শতাংশ কমতে পারে। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায়ও এলপিজি ও জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ চীন ও ভারত থেকে জরুরি ডিজেল আমদানি শুরু করেছে, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতামত: মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্র আশা করলেও ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও অটুট। হরমুজ প্রণালী খোলা না হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে।
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়ছে। সরকারের প্রতি আহ্বান, জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং বিকল্প উৎস খুঁজে বের করার।








