
বিশেষ প্রতিবেদন | জাতীয় | ৫ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর নবগঠিত সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—অর্থনীতি। দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলার সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা দূর করাই এখন নীতিনির্ধারকদের প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
১. জনমনে স্বস্তি: দ্রব্যমূল্য ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হলো বাজারের স্থিতিশীলতা। গত কয়েক বছরে হু হু করে বেড়ে যাওয়া নিত্যপণ্যের দাম মধ্য ও নিম্নবিত্তের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে ‘মধ্যস্বত্বভোগী’ বা সিন্ডিকেটের প্রভাব দূর করতে না পারলে জনমনে আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। মুদ্রাস্ফীতিকে এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনা হবে সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার।
২. বিনিয়োগকারীদের আস্থা: নীতিমালার ধারাবাহিকতা
দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থিতিশীলতা পছন্দ করেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং হুটহাট নীতি পরিবর্তনের কারণে অনেক বড় বিনিয়োগকারী বর্তমানে ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ (Wait and See) নীতি গ্রহণ করেছেন। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত এবং দীর্ঘমেয়াদী কর ও শুল্ক কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
৩. ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও খেলাপি ঋণ: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম এবং বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কাটানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে বড় প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। নতুন সরকারকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই খাতে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।
৪. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলার সংকট: রপ্তানি আয় এবং রেমিট্যান্স বাড়লেও ডলারের বহুমুখী বিনিময় হারের কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ কমছে না। হুন্ডি বন্ধ করে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর উৎসাহ তৈরি করা এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রিজার্ভকে শক্তিশালী করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
৫. কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও তরুণ প্রজন্ম: নতুন সরকারের প্রতি তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা অনেক বেশি। শিক্ষিত বেকারত্ব দূর করতে বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান হবে না, আর কর্মসংস্থান না হলে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, “শুধুমাত্র গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিনিয়োগকারীদের ফেরানো যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন দৃশ্যমান আইনি সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা।”
নতুন সরকারের সামনে পথটা বেশ কণ্টকাকীর্ণ। তবে চ্যালেঞ্জগুলো যদি সঠিকভাবে চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশ দ্রুতই তার হারানো অর্থনৈতিক গতি ফিরে পাবে। জনমনে আস্থার প্রতিফলন ঘটবে তখনই, যখন সাধারণ মানুষ তার জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে দেখবে।








