
ঢাকা, ২৫ মার্চ ২০২৬: ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশে তেলের সরবরাহে তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ঈদের ছুটি শেষ হতেই রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় পেট্রল ও অকটেনের পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি পড়েছে। অনেক পাম্পে ‘তেল শেষ’ লিখে বোর্ড ঝুলিয়ে দিতে হয়েছে। পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, যেকোনো মুহূর্তে সারাদেশের ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল গতকাল রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, “প্রতিদিন কোম্পানিগুলো যে পরিমাণ জ্বালানি বরাদ্দ দিচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ঈদের ছুটিতে ডিপো থেকে সরবরাহ বন্ধ ছিল। এখন হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাম্পগুলোতে চরম চাপ তৈরি হয়েছে। মোটরসাইকেল আরোহীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। পাম্প কর্মীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত। নিরাপত্তাহীনতা ও জোর করে তেল নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সরকার যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমরা সব পাম্প বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব।”
জ্বালানি সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। স্ট্রেইট অব হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। বাংলাদেশ তার জ্বালানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে পেট্রল ও ডিজেলের দুই সপ্তাহের মজুত রয়েছে, অকটেনের চার সপ্তাহের। তবে ঈদের পর ফিরতি যাত্রা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হওয়ায় চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে।
আরও পড়ুন:
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ আজ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। কয়েকটি জাহাজ ইতিমধ্যে এসেছে, আরও কয়েকটি আসার পথে। ঈদের দুই দিন ডিপো বন্ধ ছিল বলে সরবরাহে সাময়িক চাপ পড়েছে। মানুষ যাতে আতঙ্কিত না হয়ে প্যানিক বাইং না করে, সেজন্য অনুরোধ করছি।” তিনি আরও জানান, সকালে পাম্প খুললেও দ্রুত তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে বাড়তি চাহিদার কারণে।
রাইডশেয়ারিং সেবায় কর্মরত চালকরা বলছেন, পেট্রল না পাওয়ায় অনেকে দিনের অর্ধেক সময় লাইনে কাটাচ্ছেন। ফলে উবার, পাঠাওসহ বিভিন্ন অ্যাপে ভাড়া বেড়েছে ২০-৩০ শতাংশ। ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা মো. শাওন জানান, “তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত তেল পাইনি। সব পাম্প বন্ধ। এভাবে চললে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে।”
আরও পড়ুন:
সরকার ইতিমধ্যে পাম্পে তেল বিক্রিতে সীমা বেঁধে দিয়েছে—মোটরসাইকেলে দুই লিটার, প্রাইভেট কারে ১০ লিটার। তবে এতে ভোগান্তি আরও বেড়েছে। পাম্প মালিকরা দাবি করেছেন, ডিপো থেকে অবাধ সরবরাহ এবং পাম্পে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জিডিপিতে ৩ শতাংশ পর্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সরকার ইতিমধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সংগ্রহের চেষ্টা করছে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জনসাধারণকে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমানো এবং প্যানিক বাইং এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে সরকার। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নতুন জাহাজ আসলে সংকট কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
(তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, ইকোনমিক টাইমস—সর্বশেষ আপডেট ২৫ মার্চ ২০২৬)








