
আজকের অস্থির পৃথিবীতে যখন যুদ্ধের বাজনা বাজছে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি থমকে দাঁড়িয়েছে আর সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে দৈনন্দিন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে, তখন আমরা কি একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছি আমাদের সেই বাতিঘরগুলোকে? যারা শিখিয়েছিলেন কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়? আজ তেমনই একজন মানুষ, শহীদ শরীফ ওসমান হাদী—আমাদের হাদি ভাই—স্মৃতির পাতায় ধুলো জমলেও যার কণ্ঠস্বর আজও বাতাসের কানে ফিসফিস করে বলে যায় ত্যাগের মহিমা।
হাদি ভাইয়ের সেই বিখ্যাত উক্তিটি আজও হাহাকার হয়ে ফিরে আসে:
“আমি যদি পাঁচ বছর বেঁচে থাকি আর সেই পাঁচ বছরের কাজ যদি আগামী ৫০ বছরে প্রভাব ফেলে, তবে ওই পাঁচ বছর বেঁচে থাকাই শ্রেয়; লক্ষ্যহীন ৫০ বছর বেঁচে থাকার চেয়ে।”
তিনি সংখ্যায় নয়, বেঁচে থাকাকে বিশ্বাস করতেন সার্থকতা আর প্রভাবে। আজ যখন আমরা দীর্ঘায়ু আর বস্তুগত উন্নতির পেছনে অন্ধের মতো ছুটছি, তখন হাদি ভাইয়ের সেই দর্শন আমাদের মুখে চপেটাঘাত করে। তিনি স্বল্প সময়ের জন্য এসেছিলেন, কিন্তু সেই স্বল্প সময়েই জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন এক অবিনাশী মশাল।
বর্তমান সময়ের অস্থিরতায় আমরা যখন দিশেহারা, তখন তার মতো একজন পথপ্রদর্শকের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
বর্তমান সমাজের স্বার্থপরতার বিপরীতে হাদি ভাই ছিলেন নিঃস্বার্থ সেবার মূর্ত প্রতীক।
যখন সবাই অন্যায়ের সাথে আপস করে পিঠ বাঁচাচ্ছে, তখন তার সেই অকুতোভয় চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বেঁচে থাকা মানে কেবল নিঃশ্বাস নেওয়া নয়।
আজকের তরুণরা যখন আইডল খুঁজে হয়রান, তখন হাদি ভাইয়ের জীবনদর্শন হতে পারে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
দেশের অর্থনৈতিক চাপ আর বৈশ্বিক সংকটে আমরা হয়তো নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। কিন্তু যারা হাদি ভাইয়ের ভালোবাসা পেয়েছিলেন, যারা তার চোখের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তারা আজও নিভৃতে চোখের জল ফেলেন। তার অভাবটা কেবল একটি শূন্যস্থান নয়, এটি একটি আদর্শের অভাব। তিনি আজ নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই ‘পাঁচ বছরের প্রভাব’ আজও আমাদের অন্তরে স্পন্দন হয়ে বাজছে।
সময় হয়তো অনেক ক্ষত ধুয়ে দেয়, কিন্তু হাদি ভাইয়ের মতো নক্ষত্ররা কখনও হারায় না। তারা হারিয়ে যায় কেবল আমাদের অবহেলায়। আসুন, আজকের এই দিন থেকে আমরা আবার নতুন করে তাকে স্মরণ করি। কেবল কান্নায় নয়, বরং তার সেই অসম্পূর্ণ স্বপ্নগুলো নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে।
“হাদি ভাই, আপনি বেঁচে আছেন আমাদের সাহসে, আমাদের লড়াইয়ে।”








