
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ এবার এক নতুন মোড় নিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আসা একটি প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। শুক্রবার চীন সফর শেষে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এই স্থগিতাদেশের বিষয়ে নমনীয়তা দেখালেও, নেপথ্যের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
ট্রাম্পের প্রস্তাব ও তেহরানের অবস্থান,
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরান যদি “বাস্তব প্রতিশ্রুতি” দেয়, তবে তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই প্রস্তাবটি আসলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেই তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তেহরান কোনো রাখঢাক না করেই এই প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছে।তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো ধরনের আলোচনা বা সমঝোতায় যেতে তারা আগ্রহী নয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পাঠানো এক বার্তায় ইরান তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। তাদের মতে, বর্তমান সময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
ইরানের ৬টি কঠিন শর্ত:
পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনার টেবিলে বসার আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ছয়টি বড় শর্ত ছুড়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই শর্তগুলো বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মেনে নেওয়া বেশ কঠিন।
শর্তগুলো হলো:
১) অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্তি: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের বিশাল অংকের আর্থিক সম্পদ অবিলম্বে অবমুক্ত করতে হবে।
২) নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
৩) হরমুজ প্রণালীতে সার্বভৌমত্ব: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিতে হবে।
৪) নৌ অবরোধ প্রত্যাহার: ইরানের সমুদ্রসীমায় এবং আন্তর্জাতিক রুটে ইরানি জাহাজের ওপর থাকা নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে।
৫) যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ: দীর্ঘদিনের সংঘাত এবং নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৬) মার্কিন সেনা প্রত্যাহার: ইরানের আশেপাশের অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত এলাকাগুলো থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বা সেনা সরিয়ে নিতে হবে।
“আগে যুদ্ধ বন্ধ, তারপর আলোচনা”
ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে ইরান এবং লেবাননসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে অস্থিরতা ও যুদ্ধ চলছে, তা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। তেহরান মনে করে, একদিকে যুদ্ধ ও আগ্রাসন চলবে আর অন্যদিকে আলোচনার টেবিল সাজানো হবে—এমন দ্বিচারিতা কাম্য নয়। বিশেষ করে লেবানন ও গাজায় চলমান পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইরান তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে কোনো আপস করবে না।
বিশ্লেষকদের মতামত: আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই প্রস্তাব এবং ইরানের প্রত্যাখ্যান প্রমাণ করে যে দুই দেশের মধ্যকার আস্থার সংকট এখন চরমে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার আগের মেয়াদে ইরানের সাথে হওয়া পরমাণু চুক্তি (JCPOA) থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, যা তেহরানের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। এখন ২০ বছরের স্থগিতাদেশের যে প্রস্তাব ট্রাম্প দিচ্ছেন, তাকে ইরান একটি “ফাঁদ” হিসেবেই দেখছে।
অন্যদিকে, ইরানের দেওয়া শর্তগুলো মূলত ওয়াশিংটনকে চাপে ফেলার একটি কৌশল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো দাবিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রতিরক্ষা নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
যদি এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসন না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। হরমুজ প্রণালীর সার্বভৌমত্ব নিয়ে ইরানের দাবি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এছাড়া, পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত না হলে ইসরায়েল এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে ইরানের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নমনীয় সুরের আড়ালে যে প্রস্তাব ছিল, তা ইরানের কঠিন শর্তের দেয়ালে বাধা পেয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন কি ইরানের এই শর্তগুলো নিয়ে পুনর্বিবেচনা করবে, নাকি নিষেধাজ্ঞার মাত্রা আরও বাড়িয়ে তেহরানকে চাপে ফেলার পুরনো পথেই হাঁটবে। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে এই দুই দেশের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।








