
জাতীয় নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য সাইবার নজরদারির ঝুঁকি এড়াতে বেইজিং বিমানবন্দরে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিনিধি দল এবং সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের চীন সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া সব ধরনের উপহার, স্মারক ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী প্লেনে ওঠার আগেই আক্ষরিক অর্থেই ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
গত শুক্রবার (১৫ মে) বেইজিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ উড়োজাহাজ ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে এই কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এই কঠোর অবস্থানের কারণে বিমানবন্দর এলাকায় এক অদ্ভুত ও চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সিঁড়ির গোড়ায় ডাস্টবিন, কেড়ে নেওয়া হলো সব উপহার
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক পোস্ট’-এর হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি এমিলি গুডিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এই ঘটনার একটি রোমাঞ্চকর বিবরণ তুলে ধরেছেন।
তিনি জানান, বেইজিং ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে, এয়ার ফোর্স ওয়ানের সিঁড়ির গোড়ায় অবস্থান নেন হোয়াইট হাউসের বিশেষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। সেখানে একটি বড় ডাস্টবিন রাখা হয়। বিমানে ওঠার আগে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা, কূটনীতিবিদ এবং সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের তল্লাশি করা হয়।
চীনা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের দেওয়া সাময়িক ব্যবহারের মোবাইল ফোন বা ‘বার্নার ফোন’, বিশেষ প্রেস পাস, স্মারক পিন, আইডি কার্ডসহ যা কিছু উপহার বা সামগ্রী দেওয়া হয়েছিল—তার সবকিছুই কেড়ে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সেই ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়। কোনো কিছুই মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিমানে তোলার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি ও সাইবার হুমকির আশঙ্কা
হোয়াইট হাউসের প্রেস পুলও পরবর্তীতে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, এই পদক্ষেপ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রটোকলের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ।
বিশেষজ্ঞ ও মার্কিন কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের সন্দেহ, চীন বা রাশিয়ার মতো দেশগুলোতে সফরকালে বিদেশি প্রতিনিধিদের যেসব ইলেকট্রনিক ডিভাইস, পেনড্রাইভ বা উপহার সামগ্রী দেওয়া হয়, সেগুলোতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম নজরদারি প্রযুক্তি বা ম্যালওয়্যার লুকানো থাকতে পারে। এর মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি চালানো বা তাদের ডিভাইসে সাইবার হামলা করার ঝুঁকি থাকে। বেইজিংয়ের মাটিতে দেওয়া যেকোনো সামগ্রীর মাধ্যমে মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর যেন কোনো ধরনের নজরদারি করা না যায়, সেই গভীর সন্দেহ থেকেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
“বিদেশ সফরে প্রাপ্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা অন্য যেকোনো সামগ্রীতে উন্নত ট্র্যাকিং বা নজরদারি প্রযুক্তি থাকার আশঙ্কা সবসময়ই থাকে। জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে এবং সম্ভাব্য সাইবার হুমকি প্রতিরোধের অংশ হিসেবেই এই প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।”
— মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তা
চীন-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের নতুন অধ্যায়?
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ নিরাপত্তা মহড়া মনে হলেও, এটি মূলত ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার গভীর অবিশ্বাস ও সাইবার যুদ্ধাবস্থার বহিঃপ্রকাশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক লড়াই তীব্র রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা চুরির অভিযোগে দুই দেশই একে অপরকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রকাশ্য ও কঠোর পদক্ষেপ বেইজিংয়ের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও, মার্কিন প্রশাসন দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহীর নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নয়—এই বার্তার মাধ্যমে তা আরও একবার পরিষ্কার হয়ে গেল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইকোনোমিক টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসের এই ধরনের কড়া নিরাপত্তা প্রটোকল নতুন কিছু নয়, তবে বেইজিং বিমানবন্দরের মতো জায়গায় প্রকাশ্যে চীনা উপহার এভাবে ডাস্টবিনে ফেলার ঘটনাটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
[তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনোমিক টাইমস ও এক্স (টুইটার)]








