
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | অনলাইন সংস্করণ
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে চরম উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য দিয়েছেন ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রথমবারের মতো একজন উচ্চপদস্থ ইসরায়েলি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি মসজিদ প্রাঙ্গণের ভেতরে ইসরায়েলি পতাকা উত্তোলন করেছেন এবং পবিত্র এই স্থলের ওপর ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা করেছেন।
ভিডিওটিতে বেন গভিরকে বলতে শোনা যায়, “আমরা সবাইকে প্রতিহত করেছি এবং আল-আকসা মসজিদ—যাকে তিনি ‘টেম্পল মাউন্ট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন—এখন আমাদের হাতে।”
বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক মহল এই ঘটনাকে একটি “বিপজ্জনক উস্কানি” হিসেবে বিবেচনা করছে। এই পদক্ষেপের ফলে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও জর্ডানের ঐতিহাসিক তত্ত্বাবধান (ওয়াসায়া)
ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণের সামগ্রিক রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জর্ডানের হাশেমী রাজপরিবারের ওপর ন্যস্ত, যা ‘ওয়াসায়া’ বা ধর্মীয় অভিভাবকত্ব নামে পরিচিত। ১৯৯৪ সালে ইসরায়েল ও জর্ডানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি, যা ‘ওয়াদি আরাবা চুক্তি’ (Wadi Araba Treaty) নামে পরিচিত, সেখানেও স্পষ্টাক্ষরে এই ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার এবং জর্ডানের তত্ত্বাবধানকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইসরায়েল।
কী এই ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা (Status Quo)?
১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে চলে আসা আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, অমুসলিমরা কেবল পর্যটক হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ে আল-আকসা প্রাঙ্গণ পরিদর্শনে যেতে পারবেন, কিন্তু সেখানে কোনো প্রকার প্রার্থনা বা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করতে পারবেন না। কেবল মুসলমানরাই সেখানে ইবাদত বা নামাজ আদায় করার অধিকার রাখেন।
বাস্তবতার চরম বিপরীত চিত্র
কাগজে-কলমে এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিতে জর্ডানের নিয়ন্ত্রণকে স্বীকার করা হলেও, বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল এর সম্পূর্ণ উল্টো আচরণ করে আসছে। ফিলিস্তিনি মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বেন গভিরের এই সর্বশেষ পদক্ষেপ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আল-আকসা মসজিদকে ইহুদিবাদীকরণের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনারই অংশ।
বিগত বছরগুলোতে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া পাহারায় প্রায় প্রতিদিনই শত শত উগ্রপন্থী ইহুদি বসতিস্থাপনকারী আল-আকসা প্রাঙ্গণে জোরপূর্বক প্রবেশ করছে। সেখানে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে তারা নীরব ও প্রকাশ্যে প্রার্থনাও সম্পন্ন করছে। আর এবার খোদ সরকারের একজন শীর্ষ মন্ত্রী সেখানে উপস্থিত হয়ে ইসরায়েলি পতাকা ওড়ানোর মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দিলেন যে, তারা আন্তর্জাতিক চুক্তির কোনো তোয়াক্কাই করছেন না।
ফিলিস্তিন ও জর্ডানের তীব্র প্রতিক্রিয়া
বেন গভিরের এই পদক্ষেপের পর জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কড়া ভাষায় নিন্দা জানানো হয়েছে। জর্ডান স্পষ্ট জানিয়েছে, আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণের ১৪৪ দুনাম জায়গার পুরোটাই মুসলিমদের একান্ত পবিত্র স্থান এবং এখানে জর্ডানের ওয়াকফ বোর্ডের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ইসরায়েলের এই চুক্তি লঙ্ঘন দ্বিপাক্ষিক শান্তি চুক্তিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (PA) একজন মুখপাত্র এই ঘটনাকে “মুসলিম উম্মাহর আবেগের ওপর চরম আঘাত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মুখে চপেটাঘাত” বলে অভিহিত করেছেন। হামাসসহ ফিলিস্তিনের বিভিন্ন প্রতিরোধ সংগঠন এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে এবং আল-আকসা রক্ষায় ফিলিস্তিনিদের গণজাগরণের আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেন গভিরের মতো একজন কট্টরপন্থী মন্ত্রীর এই ধরনের উসকানিমূলক আচরণ কেবল ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটেরই অবনতি ঘটাবে না, বরং এটি একটি আঞ্চলিক ধর্মীয় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বারবার জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে আসলেও ইসরায়েলের বর্তমান অতি-ডানপন্থী সরকার তা ক্রমাগত উপেক্ষা করে চলেছে।
বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে আল-আকসা মসজিদ ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। পবিত্র এই প্রাঙ্গণে ইসরায়েলি পতাকা ওড়ানোর মতো ধৃষ্টতা চলমান গাজা ও পশ্চিম তীরের উত্তেজনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বোদ্ধারা। বিশ্ব সম্প্রদায় এখনই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই উসকানি থেকে এক ভয়াবহ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।








