
বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি। তবে এই সংঘাত কেবল প্রথাগত সমরাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি রূপ নিয়েছে এক অসম ও প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধে। একদিকে বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের অত্যাধুনিক সব সমরাস্ত্র, অন্যদিকে ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি সাশ্রয়ী কিন্তু কার্যকর ড্রোন। এই দুইয়ের লড়াই এখন বিশ্ব সমরবিদদের আলোচনার কেন্দ্রে।
সাধারণত সমর শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ধরা হয় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের হাতে রয়েছে এফ-৩৫ এর মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু ইরান এই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে এক অভাবনীয় কৌশলে। তারা ব্যবহার করছে তথাকথিত ‘সুইসাইড ড্রোন’ বা কামিকাজে ড্রোন, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো শাহেদ-১৩৬।
যেখানে একটি মার্কিন মিসাইল বা ইন্টারসেপ্টর দিয়ে শাহেদ-১৩৬ ধ্বংস করতে কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ হয়, সেখানে ইরানের এই ড্রোনগুলোর নির্মাণ খরচ মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। এই ‘লো-কস্ট’ প্রযুক্তি দিয়ে ইরান মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত ও বিদ্ধস্ত করে তুলছে।
প্রতিদিন শত শত শাহেদ-১৩৬ ড্রোন লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। এর বিশেষত্ব হলো এটি রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম এবং একসাথে ঝাঁক বেঁধে (Swarm attack) হামলা চালাতে পারে। মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করছেন যে, এই ড্রোনগুলোর নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানার ক্ষমতা তাদের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরাইলের বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে এই ড্রোনগুলো নিয়মিত আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
ইরানের ওপর বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে ড্রোনের এই বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। একে দেখা হচ্ছে এক ‘অসম যুদ্ধ’ হিসেবে, যেখানে দামি অস্ত্রের বিপরীতে সস্তা ড্রোনের জয়জয়কার। এই ড্রোনগুলো কেবল হামলা নয়, বরং প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোকেও উন্মোচিত করে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন যে ড্রোনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তা কেবল যুদ্ধের শব্দ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের পরিবর্তনের সংকেত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি দিয়েও ইরানের এই ড্রোন আক্রমণ পুরোপুরি রুখতে পারছে না। ফলে এই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।








